দেশের তৈরী পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্পে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে কমপ্লায়েন্স বা শ্রমমান অনুসরণের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তবে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে কম মজুরি দেয়া, ওভারটাইমের প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা, নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি রেখে কাগজে-কলমে সব ঠিক দেখানো এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিলে কৌশলে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়ার অভিযোগ বাড়ছে। শ্রমিক সংগঠন, শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এবং শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোগত নিরাপত্তায় অগ্রগতি হলেও শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়ায় কমপ্লায়েন্সের বড় একটি অংশ এখনো কাগজেই সীমাবদ্ধ।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের (ডিআইএফই) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের আওতায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে কয়েক হাজার কারখানায় নিয়মিত ও বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন অভিযোগ শনাক্ত করে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ডিআইএফই পরিদর্শনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে অনিয়মের মধ্যে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম রেজিস্টারে অসঙ্গতি, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি, শ্রমিকদের ছুটি না দেয়া এবং নিয়োগপত্র ও সার্ভিস বুক সংরক্ষণে ত্রুটি উল্লেখযোগ্য। অনেক কারখানাকে সংশোধনী নোটিশ দেয়া হলেও পুনঃপরিদর্শনে একই ধরনের অনিয়মও ধরা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংগঠনটির দুই হাজারের বেশি সদস্য কারখানায় প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্র্যান্ডগুলো এখন অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে শ্রমমান, মানবাধিকার এবং সামাজিক কমপ্লায়েন্সকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে; কিন্তু শ্রমিকদের অভিযোগ, বিদেশী ক্রেতাদের অডিটের আগে অনেক কারখানায় বাড়তি প্রস্তুতি নেয়া হয়। উপস্থিতি রেজিস্টার, ওভারটাইম শিট এবং নিরাপত্তা নথি হালনাগাদ করা হলেও বাস্তবে শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ সবসময় সেই মানের থাকে না।
গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন নির্ধারিত আট ঘণ্টার কাজ শেষে আরো দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ওভারটাইমের জন্য দ্বিগুণ হারে মজুরি দেয়ার বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কর্মঘণ্টার তুলনায় কম সময় দেখিয়ে বেতন দেয়া হয়। কয়েকজন শ্রমিক তাদের পে-স্লিপ দেখিয়ে দাবি করেন, মাসে বাস্তবে ৬০ থেকে ৭০ ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করলেও পে-স্লিপে ৪০ থেকে ৪৫ ঘণ্টা উল্লেখ করা হয়েছে।
সাভারের একটি পোশাক কারখানার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন ফেরদৌস আহমেদ। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, মাসে প্রায় প্রতিদিনই রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়; কিন্তু বেতনের কাগজে কম ওভারটাইম দেখানো হয়। প্রতিবাদ করলে বলা হয়, কাজ করতে না চাইলে অন্য লোক নেয়া হবে। নারায়ণগঞ্জের একটি নিট পোশাক কারখানার আরেক শ্রমিক বলেন, বিদেশী অডিটর এলে আগেই বলে দেয়া হয় কী বলতে হবে। সে দিন সবাইকে সময়মতো ছুটি দেয়া হয়; কিন্তু অডিট শেষ হলে আগের নিয়মেই কাজ চলে।
এ দিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, শুধু ওভারটাইম নয়, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নিলেও অনেকসময় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গ, উৎপাদনে বাধা বা অনুপস্থিতির অভিযোগ এনে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। সরাসরি বরখাস্ত না করে বিভাগ পরিবর্তন, দীর্ঘদিন কাজ না দেয়া, লে-অফ ঘোষণা কিংবা চুক্তি নবায়ন না করার মতো কৌশলও ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের একটি বড় অংশ ছিল মজুরি, ওভারটাইম এবং অন্যায্য চাকরিচ্যুতিকে কেন্দ্র করে। অনেক শ্রমিক আদালতে যেতে চান না, কারণ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং নতুন চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলেছে, কর্মক্ষেত্রের অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও শ্রমিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কার্যকর সামাজিক সংলাপ এবং সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরো কাজ করতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরো স্বাধীন ও কার্যকর করারও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
শ্রম অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিদর্শনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং ডিজিটাল মনিটরিং চালুর কাজ চলছে। তবে দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যার তুলনায় পরিদর্শকের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে সব কারখানায় নিয়মিত নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শিল্পগুলোর একটি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তায় কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক পরিবেশবান্ধব (গ্রিন) পোশাক কারখানার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে। কোনো কারখানায় অনিয়ম থাকলে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত। পুরো শিল্পকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সঙ্কট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কারখানা চাপের মধ্যে রয়েছে। অনেকসময় অর্ডার কমে যাওয়ায় শ্রম আইন অনুযায়ী লে-অফ ঘোষণা করতে হয়।
বাংলাদেশী শ্রমিক অধিকারকর্মী এবং সম্মিলিত গ্রার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (এসজিএসএফ)-এর সভাপতি নাজমা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, কমপ্লায়েন্স বলতে শুধু ভবনের নিরাপত্তা বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বোঝায় না। শ্রমিকের প্রকৃত কর্মঘণ্টা, যথাযথ ওভারটাইম, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সাপ্তাহিক ছুটি, সংগঠন করার অধিকার এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, রফতানি ধরে রাখতে হলে শুধু ভবন নিরাপদ করলেই হবে না। শ্রমিক যদি তার ন্যায্য মজুরি না পান কিংবা ভয়ভীতি ছাড়া ইউনিয়ন করতে না পারেন, তাহলে প্রকৃত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত হয়েছে বলা যাবে না।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজিটাল উপস্থিতির তথ্য, পে-স্লিপ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন পরিশোধের তথ্য একসাথে মিলিয়ে দেখলে ওভারটাইম জালিয়াতির অনেক ঘটনা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। এ জন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার আইনে স্বীকৃত। ইউনিয়ন করার কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চাকরি হারানোর অভিযোগ এলে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন মানবাধিকার ও সাপ্লাই চেইন-সংক্রান্ত নীতিমালা, করপোরেট ডিউ ডিলিজেন্স এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বাড়তি নজরদারির কারণে বাংলাদেশের শিল্প খাতকে এখন শুধু কাগজে নয়, বাস্তবেও শ্রমমান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে রফতানি আদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।