‘জনগণ রাষ্ট্রের মালিক’, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক দর্শন এটি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা কথায় কথায় বলি, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি সত্যি রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে মালিক অথবা সেবাগ্রহীতা যারা অফিস-আদালতে তাদের সমস্যা নিয়ে যান, তখন তারা যেন আপনাদের সেবায় কিছুটা হলেও মালিকানা অনুভব করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।’
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ, রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে নাগরিককে মর্যাদার সঙ্গে সেবা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই প্রত্যাশার একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। দেশের বহু সরকারি অফিস, আদালত, থানা কিংবা সরকারি হাসপাতালের চিত্র এখনো এমন যে, সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রের মালিক নয়, বরং অসহায় আবেদনকারী হিসেবে অনুভব করেন। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষা, অপ্রয়োজনীয় হয়রানি, দায়িত্বহীন আচরণ, তথ্য গোপন, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং কোথাও কোথাও উৎকোচের অভিযোগ নাগরিকের আস্থা নষ্ট করে। বিপরীতে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ধারীরা তুলনামূলক দ্রুত ও সহজে সেবা পান, এমন অভিযোগও নতুন নয়।
শুধু বক্তব্যে পরিবর্তন আসে না: একজন প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য প্রশাসনের জন্য নীতিগত দিকনির্দেশনা হতে পারে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা। ইতিহাস বলছে, প্রশাসনিক সংস্কারে সফল দেশগুলো শুধু নৈতিক আহ্বানের ওপর নির্ভর করেনি; তারা জবাবদিহি, প্রযুক্তি, স্বচ্ছতা এবং কঠোর তদারকির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
বিশ্বব্যাংক বহুবার উল্লেখ করেছে যে, সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো Accountability (জবাবদিহি), Transparency (স্বচ্ছতা) এবং Citizen Participation (নাগরিক অংশগ্রহণ)। একইভাবে ইউনেস্কো ও ওইসিডি নাগরিককেন্দ্রিক সরকারি সেবাকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করে। সিঙ্গাপুরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত তদন্তের জন্য শক্তিশালী ব্যবস্থা রয়েছে। সেবা প্রদানে বিলম্ব বা অনিয়ম হলে তা সহজেই রিপোর্ট করা যায়। যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (Ombudsman) কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দক্ষিণ কোরিয়া অনলাইন নাগরিক অভিযোগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরকারি সেবার মান পর্যবেক্ষণ করে এবং অভিযোগের অগ্রগতি নাগরিক নিজেই অনুসরণ করতে পারেন। এস্তোনিয়া, যাকে বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল রাষ্ট্র বলা হয়, সেখানে অধিকাংশ সরকারি সেবা অনলাইনে হওয়ায় কর্মকর্তা ও নাগরিকের অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমেছে। ফলে হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগও কমেছে।
বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। সরকারি সেবা পেতে হয়রানির শিকার হতে হয় পদে পদে। তাই শুধু বক্তৃতা নয়, কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নাগরিক সেবার পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। সরকারি অফিস, থানা ও হাসপাতালে উচ্চমানের সিসিটিভি স্থাপন এবং নিয়মিত ফুটেজ পর্যালোচনা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান স্থানে অভিযোগ বক্স রাখা এবং তা নিয়মিত খোলা। একটি কেন্দ্রীয় হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর বা ডিজিটাল অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু করা, যেখানে ছবি, ভিডিও ও অডিওসহ অভিযোগ পাঠানো যাবে। অভিযোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট ট্র্যাকিং নম্বর প্রদান, যাতে অভিযোগকারী অগ্রগতি জানতে পারে।
সরকারি সেবার সময়সীমা (Service Charter) দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন এবং তা না মানলে জবাবদিহির ব্যবস্থা। সেবাগ্রহীতার সন্তুষ্টি মূল্যায়নের জন্য অফিস ও হাসপাতালে ডিজিটাল ফিডব্যাক কিয়স্ক বা কিউআর কোড ব্যবস্থা।
দুর্নীতি বা অসদাচরণের অভিযোগে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা। ভালো কাজের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সরকারি হাসপাতাল এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আসে। সেখানে যদি রোগী বা স্বজন দুর্ব্যবহার, অবহেলা কিংবা দালালচক্রের শিকার হয়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে রোগী সহায়তা কেন্দ্র, অভিযোগ গ্রহণ ডেস্ক, স্বয়ংক্রিয় টোকেন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত আচরণ মূল্যায়ন চালু করা হলে সেবার মান উন্নত হতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য থানাকে হতে হবে নাগরিকের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অভিযোগ গ্রহণে অনীহা, অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা প্রভাবশালীদের প্রভাব, এসব অভিযোগ দূর করতে প্রতিটি থানায় ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন পরিদর্শন ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করা মানে শুধু অধিকার দাবি করা নয়; দায়িত্বও পালন করা। সরকারি সম্পদ রক্ষা, আইন মেনে চলা, কর পরিশোধ, মিথ্যা অভিযোগ না করা এবং দুর্নীতিতে অংশ না নেওয়াও নাগরিক দায়িত্বের অংশ। অপরদিকে, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক, এই বাক্যটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা সংবিধানের ভাষা হয়ে থাকলে চলবে না। এটি বাস্তবে প্রতিফলিত হতে হবে সরকারি অফিস, আদালত, থানা এবং হাসপাতালে প্রতিদিনের আচরণে।
লেখক: সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল