প্যারিসের আইফেল টাওয়ার যখন গোধূলির আলোয় ঝলমল করছিল, ঠিক তখনই মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ফলাফল ফরাসি রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন কেবল নতুন মেয়র বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল না, বরং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার এক বাস্তব পরীক্ষা। দীর্ঘ প্রচারণা, উত্তপ্ত বিতর্ক এবং টানটান প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর প্যারিসবাসী তাদের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ করেছে। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো অভিবাসী কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতি, যেখানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিদের সাফল্য বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।
২২ মার্চ ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী এমানুয়েল গ্রেগোয়ার প্রায় ৫১.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্যারিসের নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ডানপন্থী জোটের প্রার্থী রশিদা দাতিকে পরাজিত করে বিদায়ী মেয়র অ্যান হিদালগোর উত্তরসূরি হন। এর মাধ্যমে প্যারিসে বামপন্থী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং সামাজিক সাম্যের প্রতিশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের যে আস্থা ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই ফলাফলে। একই সঙ্গে অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর ভোট এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যেখানে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
এবারের নির্বাচনে সিটি কাউন্সিলর পদে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সাফল্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। প্যারিসের ১৮তম অ্যারনডিসমেন্ট থেকে শরীফ আল মমিন, ১৯তম অ্যারনডিসমেন্ট থেকে রেজওয়ান আহমেদ, সাঁ দ্যনি থেকে নাহিদুল ইসলাম, ক্রেতেই শহর থেকে ফাহিম মোহাম্মদ, ইভ্রি সুর সেন থেকে জুবায়েদ আহমেদ এবং স্থা শহর থেকে কৌশিক রাব্বানী খান কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে তাদের এই সাফল্য বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নতুনভাবে দৃশ্যমান করেছে।
প্রথম দফার ভোটে সাঁ দ্যনি থেকে বিজয়ী হয়েছেন নাহিদুল ইসলাম। বামপন্থী লা ফ্রঁস আঁসুমিজ সমর্থিত প্যানেল থেকে তার জয় স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। একই নির্বাচনে স্থা শহর থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন কৌশিক রাব্বানী খান। দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তিনি কমিউনিটিতে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ক্রেতেই শহর থেকে ফাহিম মোহাম্মদ এবং ইভ্রি সুর সেন থেকে জুবায়েদ আহমেদের বিজয়ও প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিরা এখন আর বিচ্ছিন্ন সাফল্যের নাম নয়, বরং ফরাসি স্থানীয় রাজনীতিতে ক্রমে একটি দৃশ্যমান শক্তিতে পরিণত হচ্ছেন।
ফলাফল ঘোষণার পর প্যারিসের গার দ্যু নর্ড, লা শাপেল এবং পান্তা এলাকায় বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিভিন্নভাবে একে অপরকে অভিনন্দন জানিয়ে এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপন করেন। বিজয়ী কাউন্সিলররা তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান, এটি ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে বৃহত্তর কমিউনিটির অগ্রগতির প্রতিফলন। তারা স্থানীয় পরিষদগুলোতে অভিবাসীদের সমস্যা, বিশেষ করে বৈধতা প্রক্রিয়া ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটির এই উত্থানের পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাত্রা। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১,৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যাদের অধিকাংশই প্যারিস ও আশপাশের শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত। ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত প্রায় ১০,০০০-এর বেশি বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফরাসি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্যারিস সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নাগরিক সেবার তথ্য বাংলায় প্রদানের সিদ্ধান্ত এই কমিউনিটির উপস্থিতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় শরীফ আল মমিন, রেজওয়ান আহমেদ, ফাহিম মোহাম্মদ, জুবায়েদ আহমেদ, নাহিদুল ইসলাম এবং কৌশিক রাব্বানী খানের নির্বাচিত হওয়া ফরাসি রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোও ক্রমশ বুঝতে পারছে যে, এই কমিউনিটির ভোট ও অংশগ্রহণ এখন নির্বাচনী সমীকরণে উপেক্ষা করার মতো নয়।
প্যারিস মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনকে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্যারিসসহ মার্সেই ও লিঁওতে বামপন্থীদের এই সাফল্য প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর মধ্যপন্থী রাজনীতি এবং মারিন ল্য পেনের ডানপন্থী অবস্থানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ফ্রান্সের আগামী দিনের রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের স্থানীয় কাউন্সিলগুলো এখন আর কেবল একক কোনো জাতিগত বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, বরং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। শরীফ আল মমিন, রেজওয়ান আহমেদ, ফাহিম মোহাম্মদ, জুবায়েদ আহমেদ, নাহিদুল ইসলাম এবং কৌশিক রাব্বানী খানের নির্বাচিত হওয়া সেই পরিবর্তনেরই শক্তিশালী চিহ্ন, যেখানে বাংলাদেশিরা আর কেবল অভিবাসী নয়, বরং স্থানীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।
তথ্যসূত্র:
দ্য গার্ডিয়ান (২৩ মার্চ ২০২৬)
Reuters (২৩ মার্চ ২০২৬)
France 24 (২২ মার্চ ২০২৬)