জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। সংসদে সরকারি  দলের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেছেন, এ সংসদের প্রথম দিন থেকেই আননেসেসারি (অপ্রয়োজনীয়) একটি জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছে। এর প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। এ সময় হইচই ও উত্তেজনা তৈরি হয়। গতকাল রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, বিরোধী দলের নেতা বলেছিলেন, উনি নাকি আমাদের মন পেতে চাচ্ছেন। কিন্তু পাচ্ছেন না, আমাদের মন কীভাবে পাবেন। উনারা যদি জুলাই আন্দোলনকে তাদের একক অর্জন বলে দাবি করতে চান তখন তো আমাদের মন ব্যথিত হয়। তখন তো আমরা তাদের এই মন কীভাবে দেব?

বিরোধী দল ও জোটের উদ্দেশ্যে এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, কিছুদিন আগে বিরোধী দলের এক সদস্য এ সংসদে বলেছিলেন যে, তৎকালীন জুলাই আন্দোলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখিয়ে এক পুলিশ অফিসার ভিডিও দেখাচ্ছিল যে, একটা গুলি করলে একটাই মরে, বাকিরা সরে না। যারা সরে না এটা নাকি তারাই ছিলেন। সেখানে তো আমরাও ছিলাম। তাহলে আমাদের ৪০০-এর অধিক সহযোদ্ধাকে আমরা কীভাবে হারালাম? এই সংসদের প্রথম দিন থেকেই আননেসেসারি একটি জুলাই সনদ নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছেন। আজকে আমি একটি সত্য তুলে ধরতে চাই। ২০১৮ সালে কোটা আন্দোলন হয়েছে। অনেকেই হয়তো জানেন না আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই লন্ডনের টাওয়ার হিলে একটি সমাবেশে উনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে কখনো আসে তাহলে এই যে কোটা সমস্যা, এ কোটাকে ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা হবে।  এম মঞ্জুরুল করিম রনির বক্তব্যের বিরোধিতা করে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম বলেন, দুঃখজনকভাবে যে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ, যে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় আজকের সংসদ, যে গণ অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় আজকে ট্রেজারি বেঞ্চের সরকার গঠন করেছেন। আজকের এই মহান সংসদে জুলাইকে আননেসেসারি বলা হয়েছে।  এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।  এ সময় সংসদ সদস্যরা হইচই শুরু করেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভিন্নতা। স্পিকার কথা বলার সময়ও সংসদ সদস্যরা হইচই করতে থাকেন। তখন স্পিকার বলেন, যখন স্পিকার কথা বলে, অনুগ্রহ করে সবাই চুপ করে বসে থাকবেন নিজের আসনে। স্পিকার বলেন, সবারই বাকস্বাধীনতা আছে। যদি কোনো বক্তব্য আপনাদের পছন্দ না হয়, এরপরই তো আপনারা একজন বক্তব্য রাখবেন, তিনি এ বক্তব্যের বিরুদ্ধে আপনাদের মতামত প্রচার করতে পারেন সুন্দর ও শালীনভাবে। যে যার বক্তব্য জাতীয় সংসদে রাখবেন এটাই আমরা আশা করি। অহেতুক একজন বক্তাকে কেউ ডিস্টার্ব করবেন না।

প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি বক্তৃতায় অনাগ্রহ এমপিদের : মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের দিনের কার্যসূচিতে ছন্দপতন ঘটেছে। আগের কয়েক দিনের মতো গতকালও দেরিতে অধিবেশন শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে কর্মসূচি থাকায় এদিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন না সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে প্রধানমন্ত্রীর আসনের পাশাপাশি ট্রেজারি বেঞ্চের অধিকাংশ আসন ফাঁকা দেখা গেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার অনাগ্রহ দেখা গেছে। এ নিয়ে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্পিকার।

গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপন করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পরে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিস নিষ্পত্তির সময় সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী ও নোটিসদাতা সংসদ সদস্যকে সংসদ কক্ষে পাওয়া যায়নি। ফলে বিধি ৭১-এর নোটিসগুলোর নিষ্পত্তি স্থগিত রেখে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শুরু করেন স্পিকার। প্রায় এক ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত হলে ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা মাঝপথে স্থগিত রেখে আবার আগের কার্যসূচিতে ফেরেন স্পিকার।

এরআগে বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ও জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলেন। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু করেন তাঁরা। সেখানেও একাধিক সংসদ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হলেও তাঁরা অনুপস্থিত ছিলেন। ট্রেজারি বেঞ্চের অধিকাংশ আসন ফাঁকা দেখা যায়। পুরো অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়া নিয়ে এক মজার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এত বজ্র সুনামগঞ্জে, জানলে বিয়েই করতাম না ওখানে : হাওর এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে আশ্রয়কেন্দ্র ও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। এ নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় বিয়ে করা নিয়ে রসিকতা করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, এত বজ্র সুনামগঞ্জে, জানলে বিয়েই করতাম না ওখানে। গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিসের ওপর আলোচনায় এ ঘটনা ঘটে। নোটিস উত্থাপন করে ওই সংসদ সদস্য জানান, তাঁর নির্বাচনি এলাকার চারটি উপজেলাই হাওরবেষ্টিত। সেখানে কৃষক ও মৎস্যজীবীরা সারা বছর খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় বজ্রপাত সেখানে যমের মতো হানা দেয়। তিনি জানান, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত হয়। বিগত সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করলেও তালগাছ রোপণ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপই দৃশ্যমান নয়।

বিশেষ করে সম্প্রতি এক দিনে দেশে ১২ জনের মৃত্যুর মধ্যে চারজনই তাঁর এলাকার। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু যখন বজ্রপাত মোকাবিলায় সরকারের সচেতনতামূলক পরিকল্পনা ও সাইরেন বসানোর ব্যবস্থার কথা বলছিলেন, তখন স্পিকারের একটি হাস্যরস সবার নজর কাড়ে। মন্ত্রীর বক্তব্য শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অনেকটা কৌতুকচ্ছলেই বলে ওঠেন, ‘এত বজ্র সুনামগঞ্জে, এত বজ্রপাত হয় জানলে তো বিয়েই করতাম না ওখানে’। স্পিকারের ব্যক্তিগত জীবনের এই সংযোগ আর রসবোধে অধিবেশনে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়।

একপর্যায়ে ত্রাণমন্ত্রী জানান, বজ্রপাতে কৃষক গবাদিপশু হারালে এখন থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সংসদ সদস্য কামরুল মন্ত্রীর ‘সাইরেন’ তত্ত্বকে নাকচ করে দেন। তিনি যুক্তি দেখান, ১০-১৫ কিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল হাওরে শুধু সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব নয়। তিনি দাবি তোলেন, হাওরের মাঝখানে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র এবং আধুনিক ‘লাইটেনিং অ্যারেস্টার’ বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। ওই প্রস্তাবকে ‘যুক্তিযুক্ত ও ভালো প্রস্তাব’ হিসেবে গ্রহণ করেন মন্ত্রী। ওই আলোচনায় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমান বলেন, তাঁর নির্বাচনি এলাকা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নে রবিবারের বজ্রপাতে একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। একই ঘটনায় সেখানে দুটি গরুও মারা গেছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews