• এআই মাত্র ২০ শতাংশ নিবন্ধিত গাড়ির তথ্য জানে
  • সব গাড়ির নির্ভুল ডাটাবেজ ছাড়া এআই সফল হবে না- মত বিশেষজ্ঞদের
  • ব্যাটারিচালিত রিকশা ও নম্বর প্লেটবিহীন যানবাহন হতে পারে ব্যর্থতার কারণ

রাজধানীর ব্যস্ততম বাংলামোটর মোড়। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলতেই চিরচেনা বিশৃঙ্খলার বদলে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য- মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে দামি প্রাইভেট কার, এমনকি কিছু ব্যাটারিচালিত রিকশাও জেব্রা ক্রসিংয়ের পেছনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর অবিরাম ঘুরে চলা আধুনিক এআই ক্যামেরার লেন্স যেন শাসাচ্ছে প্রত্যেককে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, ঢাকার রাজপথে বুঝি শৃঙ্খলা ফিরল বলে! কিন্তু একটু গভীরে তাকালে এবং বিশেষজ্ঞের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই তথাকথিত ‘স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা’ আসলে একটি ডিজিটাল মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ মাত্র ২০ শতাংশ নিবন্ধিত গাড়ির তথ্য জেনে এআই সব সমস্যার সমাধান করে দেবে, এটি ভাবা একটি অলীক কল্পনা বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ৭ মে থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করেছে। এই সিস্টেম মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিওফুটেজ বিশ্লেষণ করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করতে সক্ষম। এরই মধ্যে ঢাকার ১২০টি প্রধান ইন্টারসেকশনকে এই প্রযুক্তির আওতায় আনতে ১০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে সরকার।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এআই সিস্টেমের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং নম্বর প্লেটবিহীন ছোট যানবাহন। এসব যান রাজপথে উল্টো পথে চলছে, জেব্রা ক্রসিং দখল করছে, অথচ এআই ক্যামেরা এদের শনাক্তই করতে পারছে না। কারণ এদের কোনো নিবন্ধন নেই বিআরটিএর ডাটাবেজে। ফলে বৈধ গাড়িচালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। তারা বলছেন, আমরা আইন মানছি আর আমাদের পাশে থাকা ব্যাটারি রিকশাটি সব নিয়ম ভেঙে চলে যাচ্ছে, অথচ প্রযুক্তির চোখ তাদের দেখছে না। এটি ডিজিটাল বৈষম্য ছাড়া আর কিছু নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই সফল হওয়ার প্রথম শর্ত হলো- রাস্তায় চলাচলকারী সব গাড়ির একটি নির্ভুল ডাটাবেজ থাকতে হবে। যাদের কোনো নম্বর প্লেটই নেই, এআই ক্যামেরা তাদের ধরবে কিভাবে? সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও এর পেছনে কোনো পরিমাপযোগ্য কৌশলপত্র নেই। পুলিশের ডাটাবেজে অনেক দুর্ঘটনা রেকর্ডই করা হয় না, ফলে কাগজে-কলমে সংখ্যা কম দেখালেও রাজপথে রক্তক্ষরণ কমেনি।

যদিও দাবি করা হচ্ছে যে বিজয় সরণি বা বাংলামোটরে অপেক্ষা করার সময় আট থেকে ১২ মিনিট থেকে কমে তিন থেকে চার মিনিটে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে এটি সাময়িক। এর আগে ২০০১ সাল থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের নামে শতকোটি টাকা জলে ঢালা হয়েছে। জবাবদিহিতার অভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই সোলার প্যানেল আর স্বয়ংক্রিয় বাতিগুলো এখন শুধুই রাস্তার শোভাবর্ধক। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় এসব এআই ট্রাফিক সিগন্যাল অকেজো হয়ে থাকতেও দেখা যায়।

সড়ক পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার সড়কের মাত্র ৭ শতাংশ রাস্তা যেখানে ২৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন, সেখানে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে জট কমানো সম্ভব নয়। এ ছাড়া এআই ক্যামেরার কারিগরি ত্রুটির কারণে ভুল মালিকের কাছে মামলার এসএমএস যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যদি নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব যানবাহনকে আইনের আওতায় আনা না যায় এবং রাজপথের দখলদারিত্ব (ফুটপাথ ও অবৈধ পার্কিং) বন্ধ না হয়, তবে এই ১০০ কোটি টাকার প্রজেক্টও পূর্বের প্রকল্পগুলোর মতো ব্যর্থ হতে বাধ্য। সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর না করে এআই প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কেবল সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেয়ার নামান্তর। প্রকৃত সমাধান প্রযুক্তির দামি লেন্সের পেছনে নয়, বরং লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর রাজপথের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে; অন্যথায় ‘এআই’ কেবলই ডিজিটাল মরীচিকা হয়ে থেকে যাবে।

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে কোনো জাদুকরী সমাধান দিতে পারে না জানিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো: শামসুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি তখনই দ্রুতগতিতে ও কম খরচে কাজ করতে পারে, যখন একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেম এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের একটি সঠিক ও বিশুদ্ধ ডাটাবেজ বিদ্যমান থাকে। বর্তমানে ঢাকার ভিআইপি রোডগুলোতে এআই ব্যবস্থা প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যকর দেখাচ্ছে, কারণ সেখানে ইজিবাইকের সংখ্যা কম, যত্রতত্র পার্কিং নেই এবং ফুটপাথে হকারদের দৌরাত্ম্য নেই। তবে ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকাগুলোতে চলাচলকারী প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়িই অনিবন্ধিত। এমতাবস্থায় মাত্র ২০ শতাংশ নিবন্ধিত গাড়ির তথ্য জেনে এআই কী করবে? যদি কেউ মনে করেন যে এআই এসে সব সমস্যার সমাধান করে দেবে, তবে তা হবে স্রেফ একটি অলীক কল্পনা। কারণ এআই নিজে কিছু করে না; এটি কেবল হাতে থাকা ডাটার বিশ্লেষণ করতে পারে।

আগের কিছু ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এর আগে জাপানিজরা ঢাকার গুলিস্তানে এমন একটি উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ সেখানে কোনো পদ্ধতি বা সিস্টেম ছিল না। আর পদ্ধতি ছাড়া এআই কাজ করতে পারে না। ঢাকার জনবহুল এলাকাগুলোতে যেখানে গাড়ির কোনো সঠিক রেজিস্ট্রেশন প্লেট আছে কি না, সেটিই নিশ্চিত নয়, সেখানে এ ধরনের প্রজেক্ট কিভাবে কাজ করবে। এটি অনেকটা অসুস্থ রোগীর ওপর ওষুধ না চালিয়ে কেবল সুস্থ রোগীর ওপর চালিয়ে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেছে বলে দাবি করার মতো, যা কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে পারে না। এআইর কার্যকর প্রয়োগের জন্য সবার আগে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ ও যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং রাস্তার সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বা অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করা জরুরি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews