২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসর আয়োজন করতে যাচ্ছে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। ১৬টি শহরে ৪৮টি দল অংশ নেবে এবং অনুষ্ঠিত হবে ১০৪টি ম্যাচ। ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা দলে দলে উত্তর আমেরিকায় এসে এই মহাযজ্ঞের সাক্ষী হতে আগ্রহী। কিন্তু এই আগ্রহকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। সোশ্যাল মিডিয়া, ট্রাভেল গ্রুপ, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং কিছু অনিয়ন্ত্রিত এজেন্সির মাধ্যমে তারা “ফিফা স্পেশাল ভিসা”, “ফুটবল ফ্যান ভিসা” কিংবা “নিশ্চিত এন্ট্রি”র মতো চটকদার নাম ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এমনকি কেউ কেউ দাবি করছে, এই তথাকথিত ভিসায় গিয়ে কাজ করার সুযোগও মিলবে।

এমন প্রেক্ষাপটে কানাডার অভিবাসন দপ্তর (IRCC) তাদের অফিসিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যারা বিশ্বকাপ উপলক্ষে কানাডায় খেলা দেখতে আসতে চান, তাদের ভিজিটর ভিসা বা প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথোরাইজেশন (eTA) এর জন্য আগেভাগেই আবেদন করা উচিত। কিন্তু এই সতর্কতামূলক বার্তাকেই কিছু অসাধু ইমিগ্রেশন ব্যবসায়ী নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে। তারা আইআরসিসির এ ফটোকার্ড দেখিয়ে সহজ সরল মানুষের পকেট কাটার ফন্দি আঁটা শুরু করেছে। তারা সহজ সরল মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, ভিজিটর ভিসা নিয়ে একবার কানাডায় ঢুকতে পারলেই হলো। এরপর বাকি কাজ তারা সামলে নেবে। কোথাও কোথাও তারা আরও ভয়ংকর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যেমন কানাডায় ঢুকেই ক্লেইম করে সরকারি ভাতা পাবেন এবং অবশেষে খুব অল্প সময়ে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। বাস্তবে এসব বক্তব্য মানুষের দুর্বলতা এবং স্বপ্নকে টার্গেট করে সাজানো প্রতারণার ভাষা, যার শেষ পরিণতি হতে পারে আর্থিক ক্ষতি।

প্রকৃত সত্য হলো, কানাডা সরকার ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য আলাদা কোনো ‘স্পেশাল ভিসা’ ক্যাটাগরি ঘোষণা করেনি। যারা কানাডায় এসে ম্যাচ দেখতে চান, তাদের সাধারণ ভিজিটর ভিসা (Visitor Visa) বা প্রয়োজন অনুযায়ী (eTA) পদ্ধতিতেই আবেদন করতে হবে। যারা ভিসার নিশ্চয়তা দেয় বা ভিজিটর ভিসায় কাজের সুযোগের কথা বলে, তারা মূলত প্রতারণার আশ্রয় নেয়। কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সি ভিসা নিশ্চিত করতে পারে না, কারণ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে কনস্যুলার অফিসারদের এখতিয়ারে। শুধু ম্যাচের টিকিট থাকাও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।

আগামী ১১ জুন ২০২৬ মেক্সিকো সিটিতে উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর, যা চলবে ১৯ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত। ১২ জুন কানাডার টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হবে দেশটির ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। কানাডার ভ্যাঙ্কুভার এবং টরন্টো এই দুই শহর বিশ্বকাপ ঘিরে অবকাঠামো ও অতিথি ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি জোরদার করছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য নির্ধারণে এবার প্রথমবারের মতো ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ (Dynamic Pricing) পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মানে হলো, ম্যাচের গুরুত্ব এবং টিকিটের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হতে পারে। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য গ্রুপ পর্বের ম্যাচের টিকিটের দাম শুরু হয়েছে ৬০ ডলার থেকে। তবে স্বাগতিক দেশ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে এই দাম ৭৫ ডলার থেকে শুরু করে ২,৭৩৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। নকআউট পর্বের রাউন্ড অফ ৩২ এর টিকিট ১০৫ ডলার এবং কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট ২৭৫ ডলার থেকে শুরু হচ্ছে। যারা ফাইনাল ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে চান, তাদের গুনতে হবে বড় অঙ্কের টাকা। ফাইনালের সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ২,০৩০ ডলার এবং ক্যাটাগরি-১ এর টিকিটের দাম ৬,৭৩০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।

টরন্টোতে প্রথম ম্যাচের টিকিট পাওয়া যাবে ৩৫৫ ডলার থেকে ১,৭৪৫ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে ভ্যাঙ্কুভারে উদ্বোধনী ম্যাচের দাম শুরু হচ্ছে ৩৬৩ ডলার থেকে। সাধারণ ভক্তদের জন্য একটি সুখবর হলো, যারা নির্দিষ্ট কোনো যোগ্য দলের একনিষ্ঠ সমর্থক, তাদের জন্য ফিফা ৬০ ডলারে ‘সাপোর্টার এন্ট্রি টিয়ার’ টিকিট বরাদ্দ রেখেছে। এই টিকিটগুলো সরাসরি সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল ফেডারেশনের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া যারা বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের জন্য হসপিটালিটি প্যাকেজের দাম ৩,৫০০ ডলার থেকে শুরু করে ৭৩,২০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। মনে রাখবেন, প্রতারণা এড়াতে টিকিট শুধুমাত্র ফিফার অফিশিয়াল সাইট (FIFA.com/tickets) থেকে কেনা উচিত।

সবশেষে একটি সতর্কবার্তা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যে প্রলোভনের বাজার তৈরি হয়েছে, তা ঠেকাতে সবাইকে একসঙ্গে সজাগ থাকতে হবে। ভিজিট ভিসা নিয়ে কানাডায় এসে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার আশ্বাসে যেন কেউ বিভ্রান্ত না হন, এ বিষয়ে কমিউনিটির সংগঠন এবং সচেতন সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘বিশ্বকাপ ভিসা’ বা ‘নিশ্চিত এন্ট্রি’র নামে মানুষকে ভুল পথে ঠেলে দিয়ে যারা বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে চায়, সেসব প্রতারকদের সম্পর্কে সতর্ক থাকুন এবং অন্যদেরও সতর্ক করুন। সজাগ দৃষ্টি রাখাই পারে অনেক পরিবারকে সর্বনাশের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে।

এ বিষয়ে টরন্টোর বিশিষ্ট ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট মনীষ পালের বক্তব্য তুলে ধরা হলো। (ভিডিও সংযুক্ত)

তথ্যসূত্র:

FIFA.com (২৮ জানুয়ারি ২০২৬)
Canada.ca IRCC (৭ জানুয়ারি ২০২৬)
Immigration and Refugee Protection Act, Section 40
IRCC Help Centre (২৮ জানুয়ারি ২০২৬)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews