একটি মেয়ের জীবনে প্রথম মাসিক (পিরিয়ড) শুরু হওয়া কেবল শারীরিক পরিবর্তন নয়, এটি তার বেড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনও অনেক অভিভাবক এ বিষয়টি নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। ফলে প্রথম পিরিয়ড শুরু হলে অনেক কিশোরীই ভয় পেয়ে যায়, লজ্জা পায় কিংবা বিভ্রান্তিতে ভোগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক তথ্য, মানসিক সমর্থন এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা থাকলে প্রথম মাসিকের অভিজ্ঞতা একটি মেয়ের জন্য অনেক সহজ ও ইতিবাচক হতে পারে। এ সময়ে পরিবারের, বিশেষ করে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুতেই আশ্বস্ত করা জরুরি
হঠাৎ শরীরে রক্তপাত দেখে যেকোনো কিশোরী ভয় পেতে পারে। তাই শুরুতেই তাকে জড়িয়ে ধরে শান্তভাবে বোঝাতে হবে যে, এটি কোনো রোগ বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটি একজন সুস্থ নারীর স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। বরং বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হওয়ার আগেই সহজ ভাষায় তাকে মাসিক সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিয়ে রাখা উচিত। এতে প্রথম পিরিয়ড শুরু হলে তারা আতঙ্কিত না হয়ে পরিস্থিতি সহজে সামলাতে পারবে।
স্বাস্থ্যবিধির পাঠ
স্যানিটারি প্যাড কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কতক্ষণ পরপর (সাধারণত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা) পরিবর্তন করতে হবে এবং ব্যবহৃত প্যাড কীভাবে কাগজে মুড়ে নিরাপদে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে- এসব বিষয় ধৈর্য নিয়ে শেখাতে হবে। মাসিকের সময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং সুতি অন্তর্বাস ব্যবহার করা সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
খাদ্যাভ্যাস ও ব্যথার উপশম
মাসিকের সময় শরীর কিছুটা দুর্বল লাগতে পারে। তাই এ সময় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, সবুজ শাকসবজি, ডিম, মাছ, ডাল, ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি পানের অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহ দিন। অনেকেরই প্রথম দিকে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের পেট বা কোমর ব্যথা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তলপেটে হালকা গরম পানির সেঁক দিলে উপকার মিলবে। তবে ব্যথা যদি অসহনীয় হয় বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলবেন?
প্রথম মাসিক নিয়ে মেয়েকে ভয় দেখানো, লজ্জা দেওয়া বা কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। ‘এটা কাউকে বলবে না’, ‘তুমি এখন অপবিত্র’-এ ধরনের ভুল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা শিশুর আত্মবিশ্বাস চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। মাসিকের সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেজাজ খিটখিটে হতে পারে, এ সময় বকাঝকা না করে সহানুভূতির সঙ্গে তার পাশে থাকুন।
কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে?
প্রথম মাসিকের পর যদি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়, টানা কয়েক দিন তীব্র ব্যথা থাকে, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, জ্বর বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়; তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু-কিশোর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেষ কথা
প্রথম পিরিয়ড একটি মেয়ের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই সময় তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিবারের ভালোবাসা, সঠিক তথ্য ও মানসিক নিরাপত্তা। একজন সচেতন অভিভাবকের একটু সহযোগিতাই পারে মেয়ের এই অভিজ্ঞতাকে ভয়ের নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের একটি সুন্দর শুরুতে পরিণত করতে।