বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চোখে জাতীয়তাবাদ ছিল এক গভীর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে সংকীর্ণ জাত্যভিমানকে তিনি প্রত্যাখ্যান করে জাতীয়তাবাদকে সর্বজনীন মানবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদ যদি অন্য জাতিকে বাদ দেয় বা ঘৃণা তৈরি করে, তবে তা মানবতার পরিপন্থী। তাঁর মতে, উগ্র জাতীয়তাবাদ মানুষের স্বাধীন চিন্তাকে বন্দী করে ফেলে।
আমরা যে অর্থে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলি, তার শুরুটা আসলে ভারতভাগের পর। একদা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জন্ম নিয়েছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ। তার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। তবে এটি বেশি দিন অখণ্ড রাখা যায়নি।
জাতীয়তাবাদী ধারণা তৈরি ও এটি নিয়ে আন্দোলন করতে প্রতিপক্ষ লাগে। এর অনুষঙ্গ হলো ঘৃণা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিমের বিরুদ্ধে পুবের মানুষের বৈষম্যের অভিযোগ ও ক্ষোভ থেকেই এর জন্ম। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, ভাত আর রুটি একসঙ্গে যায় না—এসব স্লোগান পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে একধরনের মনস্তত্ত্ব তৈরি করেছিল। এর প্রতিফলন ছিল রাজনীতিতে। পাকিস্তানি শাসন মানে বিদেশি শাসন, বাঙালির শত্রু হলো অবাঙালি, বাঙালির আলাদা রাষ্ট্র চাই। তবে এটি নিছক একটি রাজনৈতিক মতবাদ ছিল না। এর সঙ্গে ছিল সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা।