ফিফা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করে বড় ধরনের বিতর্কের মুখে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা এবং কনকাফ ও এএফসির বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকির পর শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে ফিফা, বিশেষ বরে ইনফান্তিানো।
সর্বশেষ যে খবর তাতে জানা গেছে, চলমান এই ইস্যুতে ‘চেয়ার’ই হারাতে চলেছেন বর্তমান ফিফা প্রধান! তাঁকে হটাতে এরইমধ্যে ৬ জনের নাম শোনা যাচ্ছেম যারা ২০২৭ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ইনফান্তিনো তিনটি প্রধান উপায়ে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাহী পদ হারাতে পারেন।
১-ফিফা কংগ্রেস কর্তৃক বরখাস্ত হওয়া, ২-ফিফার বিচার বিভাগীয় সংস্থা কর্তৃক ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ হওয়া, ও ৩-চাপের মুখে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। এছাড়াও, সদস্য ফেডারেশনগুলো ২০২৭ সালের মার্চে অন্য কাউকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে তার মেয়াদ সমাপ্ত করতে পারবে।
এখানে উল্লেখ্য, ফিফা কাউন্সিলে ৩৭ জন সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে সভাপতি, ৮ জন সহ-সভাপতি এবং ২৮ জন অন্যান্য সদস্য রয়েছেন। কাউন্সিলের ক্ষমতা রয়েছে ফিফা মহাসচিবকে নিয়োগ ও বরখাস্ত করার। তবে, সংবিধানে এই সংস্থাকে সভাপতির ওপর অনুরূপ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কারণ, সভাপতি ফিফা কংগ্রেস দ্বারা নির্বাচিত হন, তাই বরখাস্তের বিষয়টিও কংগ্রেসের এখতিয়ারভুক্ত। কাউন্সিলের কোনো সভা ব্যাখ্যা চাইতে পারে, তদন্তের পরামর্শ দিতে পারে, বা পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে পারে, কিন্তু সরাসরি ইনফান্তিনোকে বরখাস্ত ঘোষণা করতে পারে না। ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিতব্য ৭৭তম ফিফা কংগ্রেসের পর ইনফান্তিনোর বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে।
সেপ ব্লাটারের নজির: ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর, এথিক্স কমিটি সেপ ব্লাটারকে ৯০ দিনের জন্য বরখাস্ত করেছিল। তৎকালীন দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী সহ-সভাপতি ইসা হায়াতু ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ফুটবল কার্যক্রম থেকে ব্লাটারের নিষেধাজ্ঞা ছয় বছরে নির্ধারণ করা হয়। ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ফিফার বিশেষ কংগ্রেসে ইনফান্তিনো নতুন সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের বাকি আর এক বছরেরও কম সময়। এর মধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে ইনফান্তিনো যুগের অবসান করে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ন্ত্রণে চেয়ারে বসবেন কে? ইনফান্তিনো নিজেও নির্বাচন করবেন। এই দৌড়ে আলোচনায় থাকা ৬ সম্ভাব্য বিকল্প প্রার্থী।
আলেকসান্দার চেফেরিন (উয়েফা সভাপতি): ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান আলেকসান্দার চেফেরিন দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর নীতিগত সিদ্ধান্তের অন্যতম কড়া সমালোচক। ইউরোপের ফুটবল সংস্থাগুলো থেকে দাবি উঠছে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী প্রার্থীকে দাঁড় করানোর, আর সেখানে চেফেরিনই সবচেয়ে যোগ্য নাম।
নাসের আল-খেলাইফি (পিএসজি সভাপতি ও ইসিএ প্রধান): প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) সভাপতি ও কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টের প্রধান নাসের আল-খেলাইফিকে নিয়ে বেশ গুঞ্জন চলছে। বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের মতো বেশ কিছু প্রভাবশালী ফুটবল ফেডারেশন ইনফান্তিনোকে হটাতে আল-খেলাইফিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্প মনে করছে। তবে খেলাইফির প্রতিনিধিরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ফিফা সভাপতি হওয়ার কোনো ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁর নেই।
দারিউস মিওদুস্কি (লেগিয়া ওয়ারশের মালিক): পোল্যান্ডের কাব লেগিয়া ওয়ারশের মালিক ও প্রখ্যাত আইনজীবী দারিউস মিওদুস্কির নামও উয়েফা অভ্যন্তরীণ আলোচনায় উঠে এসেছে। জার্মানি, স্পেন, সুইডেন, নরওয়ে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার শীর্ষ কর্তাদের মাঝে তাঁকে নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ইউরোপের সব দেশ এক ছাতার নিচে না এলে তাঁর জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব ফেলা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।
ভিক্টর মন্তালিয়ানি (কনকাকাফ সভাপতি): কানাডিয়ান এই ফুটবল প্রশাসক কনকাকাফকে দক্ষ হাতে পরিচালনা করছেন এবং ফিফার ক্ষমতা নেওয়ার গোপন আকাক্সক্ষা তাঁর অনেক দিনের। ২০২৩ সালে সর্বসম্মতিক্রমে কনকাকাফের সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানানো কনকাকাফের ভেতরে মন্তালিয়ানির সমর্থন বেশ জোরালো। গুঞ্জন রয়েছে, ২০২৭ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেও সাম্প্রতিক সংকটের মুখে আগামী নির্বাচনেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রার্থিতা ঘোষণা করতে তৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি।
শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা (এএফসি সভাপতি):
বাহরাইনের এই প্রভাবশালী ফুটবল কর্মকর্তা একসময় ইনফান্তিনোর বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে ফিফার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের (এএফসি) ৪৭টি সদস্য দেশকে এক করে চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। এএফসি প্রকাশ্যে ফিফা প্রশাসনে ‘জরুরি সংস্কার ও পর্যালোচনার’ দাবি তুলেছে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ইনফান্তিনোর কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়া শেখ সালমান কি তবে এবার প্রতিশোধের দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নামবেন? আর্সেন ওয়েঙ্গার (ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান): তালিকায় সবচেয়ে চমকপ্রদ নাম আর্সেন ওয়েঙ্গার। আর্সেনালের সাবেক এই কিংবদন্তি ম্যানেজার বর্তমানে ফিফার ‘চিফ অব গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খেলার নিয়মে আধুনিক পরিবর্তন আনতে ওয়েঙ্গার সব সময়ই সাহসী।
পূর্বকোণ/কিরণ/পারভেজ