বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়ার শাহাদাতবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমাদের সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ও অপেক্ষা করছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন সময়ে আমরা হেসেখেলে চললে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সময়ের সেরা রিপোর্ট হিসেবে বিবেচনা করলে বলা যায়, সময়টা সত্যিই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, গত কিছুদিনে যা ঘটে চলেছে তা থেকে সমীকরণ টানা খুব সহজ নয়। একটি সমাজকে বুঝতে হলে যেসব বিষয়ের দিকে চোখ রাখতে হয় তার মধ্যে রয়েছে আর্থসামাজিক বাস্তবতা; ২, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি; ৩. আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘের সাধারণ সভার সভাপতি নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা গেলে বলা যায়, এটি একটি ইতিবাচক বাস্তবতা। বিগত ৪০ বছরের মধ্যে এটি বাংলাদেশের একটি বড় বিজয়। যদিও এর আগে যখন এ পদ বাংলাদেশ পেয়েছিল তখন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না বরং আঁতাতের রাজনীতি চলছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট পরিচিতি অর্জন করেছে। এ নির্বাচনে পাকিস্তানের সমর্থনকেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। লড়াইটা হাড্ডাহাড্ডি হলেও অর্জন কম নয়। যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি মূলত ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফসল। বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে জাতিসংঘের রিপোর্টে তার বিবরণ রয়েছে। সেদিক থেকে দেখলে এই বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের বিজয়ের স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক এই বিজয়ের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা মিলালে ভিন্ন চিত্র আসে। গত কদিনে তিনটি প্রতীকী উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে। ১. সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর হটলাইন বিচ্ছিন্ন। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের মতোই উদ্বেগজনক। ২. এক মায়ের প্রতি অবেহেলাকে কেন্দ্র করে জাতীয় বিবেকের উন্মেষ। যদিও এ ধরনের ঘটনা একটি নয়, সারা দেশে অজস্র ঘটছে। ৩. মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারের প্রতি নরপশুর হামলে পড়ার ঘটনায় গোটা জাতি মানুষ্যরূপী হিংস্র হায়নার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম না হলেও মানুষের রোষ অতীতে কখনো এতটা পরিলক্ষিত হয়নি। এই বাস্তবতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে জামায়াতের ভাষায় পথ দেখাতে ছায়া সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এদিকে গোটা জাতি যখন যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এককাট্টা, ঠিক তখন স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম জাতীয় প্রেস ক্লাবের একজন কথিত সদস্যকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়নও সে পথে হাঁটছে। এসব বিবেচনায় অবশ্যই বলা যায়, সমাজের শ্রেণি-পেশার সর্বস্তরে বিশৃঙ্খলা গেড়ে বসেছে। এই বাস্তবতায় যেখানে জাতি গঠনে সামাজিক শৃঙ্খলা প্রত্যাবর্তনে সম্মিলিত কাজ করার আবশ্যিকতা জরুরি, সেখানে ভিন্নধারার আলামত পাওয়া যাচ্ছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণে সেঞ্চুরি করে উল্লাসে ঘুরে বেড়ানোর মতো প্রগতিশীল পরিস্থিতি যখন সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছিল, তখন জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমাদের মেয়েরা যখন স্কুল-কলেজে যায়, তারা ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়। বহু মেয়ে স্কুলে পড়া ছেড়ে দিয়েছে। অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। অনেকে বাসা পাল্টিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে গার্মেন্টে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। কর্র্মক্ষেত্রে যাতায়াতের পথে তাঁরা প্রায়ই যৌন নিপীড়নের শিকার হন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা অহরহ কিন্তু এ যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ হয়েছে প্রায় ২২ মাস। সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গেল মে মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। মনিটরিং প্রতিবেদন অনুযায়ী এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩১২টি। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২৬টিতে। বলা হচ্ছে- ধর্ষণ সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি এবং আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সম্প্রতি যে মাত্রায় কন্যাশিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন বেড়েছে, তাতে আমাদের কোন পরিবারই নিরাপদ, সে কথা কোনো বিবেচনাতেই বলা যাবে না। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমলে একসময় অ্যাসিড সন্ত্রাসের মারাত্মক বিস্তার হয়েছিল। তিনি কঠোর হাতে তা দমন করেছিলেন। আর প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে বলতে গেলে এসব ছিলই না। অথচ ১৯৭৩-’৭৪ সালের পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, স্কুল-কলেজগামী কোনো মেয়ে নিখোঁজ হলে তাদের খুঁজতে গুলিস্তানের একটি যুবসংগঠনের অফিসে যেতে হতো। সুতরাং নারী-শিশুর প্রতি নরপশুদের হামলার পেছনে কোনো না কোনো মহলের ইন্ধন থেকে থাকতে পারে। এর নির্মূল জরুরি। চড়া সুদের ক্ষুদ্রঋণের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে সমাজে। গ্রাম, মহল্লা, বস্তি বা বাসাবাড়িতে এ ঋণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামাজিক নৈরাজ্য বিশৃঙ্খলা এমনকি পারিবারিক হত্যা-আত্মহত্যার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া মূল্যস্ফীতি বাজারদর সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় নানা সংস্থার কাছ থেকে বেঁচে থাকার নিমিত্তে যে কথিত ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণ করছে, তার পরিণতিতে জর্জরিত মানুষ শেষতক হয় বড় ধরনের জালিয়াতি, অভিনব প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। না কুলাতে পারলে শেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এই প্রবণতা রোধে সরকার শুরু থেকে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করছে ইতোমধ্যে তাকে প্রকাশ্যে ভুয়া বলে চিৎকার করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে কর্ম বিনিয়োগের বন্ধ্যত্ব। বেকারের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা না গেলে দয়া, দান বা কেবল সাহায্য-সহযোগিতা পরিস্থিতি উত্তরণের পথ বা পদ্ধতি নয়। হতে পারে না। সময় পাল্টেছে পাল্টাচ্ছে। তবু আল্লাহর রসুল (সা.)-এর উদাহরণটি বোধ করি নেওয়া যায়। ভিখারিকে তাঁর সামর্থ্যরে সম্বল বিক্রি করে কুঠার কিনে স্বাবলম্বী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং এতে কাজ হয়েছে। ভিখারির হাতকে স্বাবলম্বীর হাতে পরিণত করেছেন। আমাদের সমাজে এখন শিক্ষিত বেকারসহ কর্মক্ষম শক্তির এক বড় অংশই বেকার। যা কাজ আছে তার মধ্যে যোগ্যতার চেয়ে তদবির বেশি। আসলে বিনিয়োগ বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে হলে সুষ্ঠু নীতি ও তার প্রয়োগে সততার কোনো বিকল্প নেই। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আস্থার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ। দেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেকারত্ব মোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা না গেলে মাদকসন্ত্রাস রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনে সফলতা অর্জন প্রায় অসম্ভব। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া দেশীয় ব্যবসায়ীদের ইজ্জত রক্ষার্থে সব ভুলে নিজে লবিং করেছেন। জিম্মাদার হয়েছেন। তার সুফল তিনি পেয়েছেন।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন সমাজ শৃঙ্খলাকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে। এটি ফ্যাসিবাদের চেয়েও মারাত্মক আকার নিয়েছে। চলমান ঘটনাবলি প্রমাণ করে সমাজের একশ্রেণির শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের কারণে সমাজ-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়ার পথে। একশ্রেণির রাজনীতিক শিক্ষক, আলেম, আমলা, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ সমাজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ মানুষই ভুলে গেছে তাদের সামাজিক দায়দায়িত্ব। অর্থের নেশা, মাদকের নেশা, প্রমোশনের নেশা, রাতারাতি টপকে যাওয়ার নেশায় পরিবেশ-প্রতিবেশ চারপাশ সব ভুলে এক আদিম উন্মাদনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এই প্রবণতার মূলে কি-কেন হচ্ছে, সেটি দেখার দায়িত্ব সমাজবিজ্ঞানীদের। তাঁরা ঠিক ব্যাপারটিতে আছেন তা মনে হয় না। গভীর গবেষণা ছাড়াও এটা বলা যায়, সমাজে মূল্যবোধের মারাত্মক অবক্ষয় হয়েছে। বিনিময় ছাড়া মানুষ মানুষের উপকার করতে ভুলে গেছে। এ বিনিময়মূল্য কী কতটা কেমন তা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যথাযথ তদারকির অভাবে সমাজগ্রন্থিতে পচন ধরেছে। মূলত একটি সমাজে নাগরিকরা যখন অধিকার বঞ্চিত থাকে ক্ষমতার দোর্দণ্ড প্রতাপে ও নিয়ন্ত্রণে থাকে তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সমাজ যখন কর্তৃত্ববাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন সমাজের সামাজিক শক্তির অবক্ষয় অবধারিত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র সমাজে দীর্ঘ সময় কর্তৃত্ববাদের একচ্ছত্র অধিপত্য থাকায় সমাজে যে অচল অবস্থা দৃশ্যমান হচ্ছে এটিকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে শনাক্তকরণ জরুরি। বিষয়টি রাজনীতির অংশ হলেও বিদ্যমান বাস্তবতায় বিশেষ বিবেচনায় দেখা জরুরি। একসময় জাতীয়তাবাদীদের সভায় যাওয়া আলোচনা করাও যখন বিপজ্জনক ছিল তখন যে মানুষটি ঘরে ঘরে গিয়ে নিজের পয়সা খরচ করে নিয়ে এসেছেন পেশাজীবীদের ব্যানারে। আপসহীন নেত্রীকে যিনি মাতৃ সম্মানে দেখেছেন, তিনি এখন সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। সেই ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে সমাজের শ্রেণি-পেশার সহানুভূতিশীল মানুষদের নিয়ে জাতীয় সংস্কার আন্দেলন শুরু করা যেতে পারে। মায়ের প্রতি দায়িত্বে অবহেলার জন্য একজন আমলা সন্তানের ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মনিটরিং জরুরি। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর ফোনের তার যদি চুরি হয় তাহলে সেখানে মনিটরিংয়ের অবস্থা কী-বলার অপেক্ষা রাখে না। সারা দেশে টিএন্ডটির ল্যান্ডফোনের তার আর মাঠে নেই, চোরের পেটে। কেবল চুরির পর ক্যামেরা দেখে শনাক্ত নয়, বরং চুরির সময় হাতেনাতে ধরার ব্যবস্থা জরুরি বিবেচ্য। একে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নেওয়া কর্তব্য। শিশু ও নারীর ওপর পাশবিকতাকে কঠোর হস্তে দমনের কোনো বিকল্প নেই। শেষ করার আগে শুধু এটুকু বলি, যারা সরকারের ভুল ধরে উচ্ছেদ উৎখাতের ব্যাপারে কোমরে গামছা বেঁধেছে বা বাঁধছেন তারা যদি এর বিপরীতে সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যৌক্তিক ও যুগপৎ কাজ করেন, সেটি সময়ের দাবিকে বেশি প্রতিফলিত করবে। সীমান্তে অসন্তোষ অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা। সব মিলে বলা যায়, দেশ থাকলে ক্ষমতাও থাকবে। আগে দেশ রক্ষা করুন। সামজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন। নাগরিকদের নিজ দেশ ভাবনায় ফিরিয়ে আনুন-সেটা হবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মূল ঐক্য।
♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক