গাজীপুরের কাপাসিয়ায় তিন সন্তান, স্ত্রী, শ্যালকসহ নিজ পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহত তিন কন্যার গলা কাটা লাশ ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শ্যালক রসুল মিয়ার লাশ ছিল বিছানার ওপর। অন্যদিকে শিশুদের মা শারমিনের লাশ জানালার গ্রিলে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখা যায়। মর্মান্তিক এ ঘটনায় গতকাল কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামের সেই বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় জমান। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে একই সঙ্গে নিহতদের বাপের বাড়ি ও নানাবাড়ি গোপালগঞ্জে চলছে শোকের মাতম। গৃহকর্তা ফোরকান মোল্লা পলাতক রয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা মাঠে নেমেছে।
গতকাল সকালে পুলিশ কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে নিহতদের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেছে। নিহতরা হলেন, ফোরকানের স্ত্রী শারমিন খানম (৩৫), তাদের বড় মেয়ে মাদ্রাসায় পড়ুয়া মীম খানম (১৪), মেজো মেয়ে উম্মে হাবিবা (৮) ও ছোট মেয়ে ফারিয়া (১ বছর ৪ মাস) এবং শ্যালক রসুল মিয়া (২২)। নিহত শারমিন গোপালগঞ্জ জেলা সদরের পাইকান্দি এলাকার শাহাদত মোল্লার মেয়ে। নিহত শারমিনের পলাতক স্বামী মো. ফোরকানও (৪০) গোপালগঞ্জ জেলা সদরের মেরি গোপীনাথপুর গ্রামের আতিয়ার রহমানের ছেলে। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারেন। পুলিশ জানায়, পলাতক মো. ফোরকান পেশায় প্রাইভেট কার চালক। তিনি প্রায় ছয় মাস আগে কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ বসবাস করছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গতকাল সকালে ঘরের ভিতর লাশগুলো পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। কাপাসিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। স্থানীয়রা জানান, গতকাল সকালে প্রতিবেশীরা ওই বাড়িতে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়ে রক্তাক্ত লাশগুলো পড়ে থাকতে দেখেন। ঘরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। প্রতিবেশী সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া বিবাদ চলত। কিন্তু ফুরকান যে এতো বড় কাজ করবে, এটা আমরা বিশ্বাস করতাম না। ফুটফুটে তিনটা বাচ্চাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের স্বজন মনির হোসেন জানান, শ্যালক রসুলকে ফোন করে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বাসায় ডেকে আনে ফোরকান মিয়া। এরপর রাতের কোনো এক সময় শ্যালকসহ পাঁচজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করে। একসঙ্গে এমন নির্মম ঘটনা আমরা জীবনেও দেখি নাই।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, লাশের পাশে ফোরকানের স্বাক্ষরবিহীন বেশ কিছু প্রিন্ট করা কাগজ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই কাগজের সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, ফুরকান এর আগে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ করেছিলেন। একই সঙ্গে ওই অভিযোগপত্রে স্ত্রীর পরকীয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। এই অভিযোগের কপি ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে শারমিন ও ফোরকান দম্পতির পারিবারিক কলহের কারণেই এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া অভিযোগের কপিগুলো এবং পারিপার্শ্বিক আলামত যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে- ফোরকান এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে কী কারণে এবং আরও কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না তা উদঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি একযোগে কাজ শুরু করছেন। বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতক ফোরকানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। পুলিশ জানিয়েছে, কাপাসিয়ার আমরাইদ এলাকা থেকে গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ফোরকানের ঘনিষ্ঠ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করেনি পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের বেশ কিছু আলামতও জব্দ করেছে পুলিশ।
ঘটনার খবর পেয়ে গাজীপুর-৪ আসনের (কাপাসিয়া) সংসদ সদস্য মো. সালাহউদ্দিন আইউবী, গাজীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তামান্না তাসনীমসহ জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার পর থানার পুলিশ, ডিবি পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল ঘিরে রাখে। বাসার ভিতরে ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা আলামত সংগ্রহের কাজ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ঘটনাস্থলে আসার পর ওই বাড়িতে সাধারণের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
নিহত শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মোল্লা জানান, প্রায় ১৭ বছর আগে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি গ্রামের আতিয়ার মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে সামাজিকভাবে শারমিন আক্তারের বিয়ে হয়। পরে ফোরকান গাড়ি চালানো শিখে নিজের সঞ্চিত কিছু টাকা, শ্বশুর বাড়ি ও স্বজনদের কাছ থেকে টাকা বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ধার করে একটি প্রাইভেট কার কিনে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শারমিনকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে। তাদের সংসারে পরপর তিনটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলে ফোরকান আবার বিয়ে করার পাঁয়তারা শুরু করে এবং শারমিনের ওপর শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। উত্তরার বাসায় একটানা বেশ কিছু দিন আটক রেখে নির্যাতন করার ফলে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় সাত মাস আগে শারমিন গোপালগঞ্জে পিতার বাড়িতে চলে যায়। সেখানে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর ফোরকান সেখানে সবার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে শারমিনকে নিয়ে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতে থাকে। ওই বাড়ির আশপাশের লোকজন জানায়, এখানে আসার পর থেকে ফোরকান ও শারমিনের মাঝে পারিবারিক কলহের জেরে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটত। শারমিনের খালাতো ভাই সাজ্জাদ মিয়া মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে আসেন। অনেক দিন ধরে তাদের মাঝে ঝগড়াঝাঁটি চলছিল। ইতিপূর্বে স্বজনরা তাদের বিভিন্ন বিষয়ে মীমাংশা করার চেষ্টা করেছেন।
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন জানান, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, খবর জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ, সিআইডি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। তদন্ত শেষে বলতে পারব যে আসলে কি কারণে ঘটনা ঘটল, কেন ঘটল, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত। এটা তদন্ত শেষে বলা যাবে। কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে। নিহতের পরিবারের এক সদস্যকে ফোন করে তিনি বিষয়টি জানিয়েছেন। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
গোপালগঞ্জে নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম : নিহত শারমিন আক্তার ও রসুল মোল্লার স্বজনদের আহাজারিতে পুরো বাড়ি ভারী হয়ে উঠেছে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রাম। ছেলে-মেয়ে-নাতনিদের হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শারমিনের মা ফেরোজা বেগম (৬০)। মেয়ে, ছেলে ও প্রিয় নাতনিদের হারিয়ে বুক চাপড়ে, বিলাপ করে তিনি শুধু বলছিলেন, আমার ছেলে মেয়ে নাতনিদের মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার টুকরাকে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব রে আল্লাহ...। তিনি বলেন, আমার বাজান (নিহত রসুল মোল্লা) গতকাল নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাড়ি গাজীপুর গেছে। কে জানতো, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া হবে। রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে। এ কথা বলেই আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শাহাদাত মোল্লা ও ফিরোজা বেগম দম্পতির চার মেয়ে তিন ছেলে (সাত ছেলে মেয়ের) মধ্যে শারমিন আক্তার তৃতীয় ও রসুল মোল্লা সবার ছোট। বড় মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এখন একসঙ্গে দুই সন্তানকে মেরে ফেলল। শারমিনের স্বজনরা জানিয়েছেন, স্বামী ফোরকান মোল্লা মাদকাসক্ত ছিল এবং বিভিন্ন সময় শারমিনের ওপর নির্যাতন করত। তাদের ধারণা ফোরকান মোল্লাই শারমিনসহ পাঁচজনকে হত্যা করেছে এবং তার পরিবারের লোকজনও এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত
থাকতে পারে। নিহত শারমিন ও রসুলদের প্রতিবেশী আবেদ আলী মীর বলেন, আমাদের ভাই (শাহাদত) গ্রাম পুলিশ ( চৌকিদার)। অনেক
কষ্ট করে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে সন্তানদের বড় করেছে। রসুল মোল্লা গাজীপুরে একটি পোশাক তৈরি কারখানায় চাকরি করত।
থাকত বড় বোন ফাতেমার বাসায়। রসুল শারমিনের বাসায় যাওয়ার পর রাত ৮টায় মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সবাই ভেবেছিল ফোনে হয়তো চার্জ নেই। ভোর সাড়ে ৫টায় জামাই ফোরকানের ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে বলে শারমিনের বাসার সবাই মারা গেছে। কীভাবে মারা গেল জানতে চাইলে সে বলে, তার ভাই তাদের ফোন করে জানিয়েছে পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফ্যালাইছি। আমাকে খুঁজলে পাওয়া যাবে না বলে ফোন কেটে দেয়। তিনি বলেন, খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।