কয়েক বছর আগেও রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের চিত্র ছিল ভিন্ন। অধিকাংশ গর্ভবতী নারী বাড়িতেই সন্তান প্রসব করতেন। পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কম হতো। বাল্যবিবাহ সামাজিকভাবে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য ছিল, আর কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, লিঙ্গসমতা ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা ছিল সীমিত। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব, কুসংস্কার এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহার কারণে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকিও ছিল উদ্বেগজনক। শুধু কান্দি ইউনিয়ন নয়, রংপুর ও লালমনিরহাটের অনেক গ্রামীণ এলাকাতেই ছিল একই চিত্র।
তবে গত দুই বছরে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এখন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে উঠান বৈঠক, বিদ্যালয়, কমিউনিটি সভা ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে। সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে নিরাপদ মাতৃত্ব, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে স্থানীয় সমাজে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম সহায়ক ‘মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (জননী)’ প্রকল্প। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে, কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)-এর অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এবং মাঠপর্যায়ে আরডিআরএস বাংলাদেশের বাস্তবায়নে ২০২৩ সাল থেকে রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার ৪০টি ইউনিয়নে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। এর লক্ষ্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা, মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানো এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসা।
২০১৭ সাল থেকে কান্দি ইউনিয়নে কর্মরত পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মোছা. নারগীস পারভিন জানান, একসময় এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাও যথাযথ ছিল না। তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালে জননী প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। গত তিন বছরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৪১৮টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।’
প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ‘জননী বন্ধু’রা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। উঠান বৈঠক, কমিউনিটি সভা এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ মাতৃত্ব, পরিবার পরিকল্পনা, প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর সেবা, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য এবং বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে শুধু নারীরাই নন, পুরুষ, প্রবীণ, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন।
উঠান বৈঠকে অংশ নেওয়া স্থানীয় রুপসা আক্তার বলেন, ‘আগে বাল্যবিবাহকে অনেকেই স্বাভাবিক মনে করতেন। এখন আমরা এর ক্ষতিকর দিক বুঝতে পারছি। নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও বাল্যবিবাহ বন্ধে উৎসাহিত করছি।’
শুধু নারীরাই নন, পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে কিশোর-কিশোরীরাও। বিভিন্ন শিক্ষা ও সচেতনতামূলক সেশনের মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্য, পুষ্টি, লিঙ্গসমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারছে। অনেকে এখন নিজের পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করতেও ভূমিকা রাখছে।
জননী প্রকল্পের গভর্নমেন্ট রিলেশন অফিসার দয়াল চন্দ্র কর্মকার জানান, এই ইউনিয়নে ৫৪ জন ইয়ুথ লিডার নিয়মিতভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে এখানে বাল্যবিবাহের ঘটনা অনেক বেশি ছিল। এখন মানুষের সচেতনতা বেড়েছে, ফলে এ ধরনের ঘটনা কমে এসেছে।’
প্রকল্পটি শুধু প্রচলিত সচেতনতামূলক সভায় সীমাবদ্ধ নয়। লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথনাটক, ভিডিও প্রদর্শনী, বিশেষ দিবস পালন এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসচেতনতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সামাজিক ট্যাবুও ধীরে ধীরে ভাঙছে।
পরিবর্তনের এ যাত্রায় যুক্ত হয়েছেন ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাও।
কান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, ‘জননী প্রকল্প চালুর পর মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা এখন অনেক সহজলভ্য হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে এই কার্যক্রম কীভাবে টেকসইভাবে চলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
প্রকল্প পরিচালক ডা. উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘কমিউনিটির মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তন এসেছে। আগে যেসব সেবা সম্পর্কে মানুষ জানতেন না, এখন তারা সেগুলো গ্রহণ করছেন এবং আমরা এই উদ্যোগগুলোকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাথে সংযুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছি।’
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের আচরণগত পরিবর্তন। একজন মা যখন নিরাপদ মাতৃত্ব সম্পর্কে সচেতন হন, একজন বাবা পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন, একজন কিশোরী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেন, তখনই একটি সমাজে টেকসই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়। রংপুর ও লালমনিরহাটের গ্রামীণ জনপদে সেই পরিবর্তনেরই বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে ‘জননী’ প্রকল্প।