গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। এবার ১১টি শিক্ষাবোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫%, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬.২ শতাংশ কম। এর মধ্যে পাসের হারে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এ বোর্ডের পাসের হার ৭১.৬৩%, আর ৫৭.৩৯% পাসের হার নিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ শিক্ষাবোর্ড। প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৯ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সর্বনিম্ন। এই ফলাফল থেকে প্রাসঙ্গিক অনেকগুলো দিক নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। শুধু পরীক্ষার্থীদের সফলতা এবং জিপিএ ৫ প্রাপ্তির মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রায় ৭ লাখ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার পেছনের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। তবে কোনো পরীক্ষায় শতভাগ পাস করবে না, এটা পরীক্ষার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু পাসের হার কতটা বাড়তে পারে, সেটা দেখা গেছে ২০২১ সালে। ওই বছর পাসের হার ছিল ৯৩.৫৮ শতাংশ। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে পাসের হারে বড় ধরনের পতন দেখা গেল; পরীক্ষা নিয়ে এটিই উদ্বেগের প্রধান জায়গা। এ ধরনের পরিস্থিতি শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থায় গভীর সংকটের ইঙ্গিত করে। কারণ, অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের পেছনে শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম রয়েছে, অভিভাবকদের বিনিয়োগ, আশা ও উদ্বেগ রয়েছে; ঠিক তেমনি রাষ্ট্রেরও বিনিয়োগ রয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী ফেল করার দায় কার? এর পেছনে আমাদের পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতির কোনো গলদ আছে কিনা, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে।


মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় যারা প্রত্যাশিত ফল অর্জন করে, তাদের ঘিরে পিতামাতা, অভিভাবক ও গণমাধ্যমের বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। যারা পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করে তাদের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস থাকে বাধভাঙা। সাফল্যের সেই আনন্দ শুধু উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ আনন্দ হয়ে ওঠে সবার। তাদের সাফল্যের জন্য অফুরন্ত শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
যেসব পরীক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল অর্জন করেছে তারা একদিকে তাদের পিতামাতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের যেমন গর্বিত করেছে, ঠিক তেমনি দেশবাসীকেও গর্বিত করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, নিয়মিত পড়ালেখা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম কখনোই বৃথা যায় না। এই ফলাফল তাদেরকে নতুন স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে। তাদের এই অর্জন নিঃসন্দেহে শিক্ষাজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে মনে রাখতে হবে, এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি নয়; এটি কেবল শিক্ষাজীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে প্রবেশের একটি সোপান মাত্র। তাদের সামনে আরও বন্ধুর পথ রয়েছে, যেগুলো অতিক্রম করতে হবে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, সময়ানুবর্তিতা ও নিয়মনীতি মেনে চলার দৃঢ় মানসিকতা দিয়ে। তাহলেই তাদের আগামী দিনগুলোও সাফল্যে ভরে উঠবে, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। তাই আজকের এই সাফল্যে আত্মতুষ্টিতে না ভোগে ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুতি নিতে হবে কঠোরভাবে। আর সব সময় মনে রাখতে হবে, এই সফলতাই শেষ নয়। সামনে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।


কিন্তু যারা প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি, তাদের প্রতিও আমাদের মনোযোগ ও সহমর্মিতা দেখানো প্রয়োজন। কারণ ফলাফল নিয়ে হতাশ হয়ে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এমনকি কেউ কেউ অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর আত্মহননের খবর বেরিয়েছে পত্রপত্রিকায়! এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। এসব ঘটে হতাশা ও অবসাদ থেকে। তাই এই সময়ে তাদের একা ছেড়ে না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো, মানসিকভাবে সাহস জোগানো এবং বোঝানো যে একটি পরীক্ষার ফলাফলই জীবনের শেষ কথা নয়; প্রত্যাশিত ফল করতে না পারায় হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানেই সারা জীবনের ব্যর্থতা নয়। বরং অপ্রত্যাশিত কোনো ব্যর্থতা অনেক সময় মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে সহায়তা করে, এভাবেও তাদের বোঝানো যেতে পারে। তাই পরবর্তী পরীক্ষার জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নিতে এবং আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, সারা দুনিয়ায় এমন বহু মানুষ আছেন, যারা তাদের জীবনের শুরুতেই হোঁচট খেয়েছেন; কিন্তু পরবর্তীকালে দৃঢ় মনোবল এবং কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিশ্বসেরা মানুষদের কাতারে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। আজ তাদের অনেকেই স্মরণীয়, বরণীয় এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।


এ পরিস্থিতিতে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের সবার প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও শুভকামনা জানাতে হবে। তাদের এটাও বোঝাতে হবে, এই পরীক্ষায় ভালো ফল করতে না পারায় আজ যারা মনে করছে, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে! আসলে কোনো কিছুই শেষ হয়নি। তাদের মনে রাখতে হবে, কোনো একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে মানুষের জীবন থেমে থাকে না কখনোই। শুধু এই একটি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে জীবনকে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। আজকের ব্যর্থতা আগামী দিনের সাফল্যের প্রস্তুতি হতে পারে নিশ্চিতভাবেই। কাজেই আর দেরি না করে আবার পড়ালেখা শুরু করতে হবে, আরও ভালোভাবে, পূর্ণোদ্যমে। আর বিশ্বাস রাখতে হবে মনে, চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই। পাশাপাশি এবারের ফল খারাপ করার ভুলগুলো চিহ্নিত করতে হবে, কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নিজে নিজে বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীদের সহযোগিতা নিতে হবে। একই সঙ্গে পিতামাতা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নির্দেশনা ও পরামর্শ মেনে চলতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতের সফলতা কেউ আটকিয়ে রাখতে পারবে না, এটা একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের পিতামাতা ও অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়েও কিছুটা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যারা এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে তাদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পিতামাতা ও অভিভাবকদের সহানুভূতিশীল আচরণ। সন্তান ভালো ফল করলে তাকে অভিনন্দন জানানো খুব সহজ; কিন্তু সন্তান যখন প্রত্যাশিত ফল করতে পারে না, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত অভিভাবকত্ব। সন্তানকে সাহস দিতে হবে, ভবিষ্যতে ভালো করার জন্য উৎসাহ দিতে হবে এবং তাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। প্রত্যাশিত ফল করতে না পারায় অভিভাবক হিসেবে নিজের দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ না করে, ব্যর্থতার মুহূর্তে সন্তানকে ভর্ৎসনা না করে এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তাকে সাহস দিতে হবে।


এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্ব আরও বেশি। শিক্ষকরা জানেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের যেমন উৎসাহিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে তারা আরও ভালো করে, ঠিক তেমনি যারা ব্যর্থ হয়েছে তাদেরও আশার আলো দেখাতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একজন সহানুভূতিশীল ও ভালো শিক্ষক কখনো কখনো একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন বদলে দিতে পারেন ইতিবাচকভাবে। কাজেই আজ যারা ভালো ফল করেছে তাদের আনন্দ যেমন সবার, ঠিক তেমনি প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল করতে না পারায় হতাশদের পাশে থাকতে হবে সবাইকে।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা), ময়মনসিংহ।
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews