বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সরিষার তেল শুধু একটি রান্নার উপাদান নয়, বরং এটি খাদ্যসংস্কৃতিরই অংশ। ভর্তা, ভাজি, মাছ, আচার—অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী খাবারে সরিষার তেলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আলাদা মাত্রা যোগ করে। অনেকের বিশ্বাস, সরিষার তেল স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আবার অন্যদিকে, বিভিন্ন দেশে এই তেল নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে। তাহলে আসল সত্য কী? সরিষার তেল কি নিরাপদ, নাকি এতে লুকিয়ে আছে স্বাস্থ্যঝুঁকি?

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, উত্তরটি এককথায় "হ্যাঁ" বা "না" নয়। এটি নির্ভর করে তেলের ধরন, পরিমাণ এবং ব্যবহারের ওপর।

সরিষার তেলের ইতিবাচক দিক

সরিষার তেলে মনো-আনস্যাচুরেটেড (MUFA) ও পলি-আনস্যাচুরেটেড (PUFA) ফ্যাট থাকে, যা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে ধরা হয়। এছাড়া এতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ই এবং কিছু প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে সরিষার তেল ব্যবহার করলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরের মানব গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সরিষার তেলের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা (Smoke Point) তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি মাঝারি থেকে উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার জন্য উপযোগী।

বিতর্কের মূল কারণ: এরুসিক অ্যাসিড (Erucic Acid)

সরিষার তেল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের নাম এরুসিক অ্যাসিড। অনেক প্রচলিত সরিষার তেলে এই ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশ বেশি থাকে।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ইঁদুর ও কিছু প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় দেখা যায়, অত্যধিক এরুসিক অ্যাসিড হৃদ্‌পেশিতে চর্বি জমার (myocardial lipidosis) সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডাসহ অনেক দেশে উচ্চ এরুসিক অ্যাসিডযুক্ত সরিষার তেলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের ক্ষেত্রে একই ধরনের ক্ষতি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি। বর্তমান বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাগুলো বলছে, প্রাণীর গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই বিষয়টি এখনও গবেষণাধীন।

তাহলে বাংলাদেশের মানুষ কি ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশ ও ভারতের বহু অঞ্চলে শত শত বছর ধরে মানুষ সরিষার তেল দিয়ে রান্না করে আসছে। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র সরিষার তেল খাওয়ার কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক হৃদ্‌রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দেন, ঐতিহ্যগত ব্যবহার মানেই শতভাগ নিরাপদ—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে সরিষার তেল ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

যেসব ভুল একেবারেই করবেন না

একই তেল বারবার গরম করে ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে ক্ষতিকর অক্সিডেশনজাত পদার্থ তৈরি হতে পারে, যা যেকোনো ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া খোলা বা ভেজাল তেল কেনা থেকেও বিরত থাকা উচিত।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

পুষ্টিবিদদের অনেকেই একটি তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর তেল পর্যায়ক্রমে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। যেমন—সরিষার তেলের পাশাপাশি সয়াবিন, সূর্যমুখী বা অলিভ অয়েলও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বিভিন্ন ধরনের উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিডের ভারসাম্য বজায় থাকে।

সরিষার তেলকে "অত্যন্ত ক্ষতিকর" বা "অলৌকিক স্বাস্থ্যকর"—কোনোটিই বলা ঠিক হবে না। বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, পরিমিত পরিমাণে, বিশুদ্ধ তেল ব্যবহার করে এবং বারবার গরম না করলে এটি একটি গ্রহণযোগ্য রান্নার তেল হতে পারে। তবে উচ্চ এরুসিক অ্যাসিড নিয়ে বিতর্ক এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈচিত্র্য বজায় রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews