ভারতের রাজধানী দিল্লি-তে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি ইফতার অনুষ্ঠান রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রেস ক্লাব ইন্ডিয়া-এর সভাপতি গৌতম লাহিড়ীর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা, ভারত সরকারের কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে অনুষ্ঠানে কারা উপস্থিত ছিলেন—তার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কারা উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের-এর একটি ফেসবুক পোস্টও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, বিশেষ আমন্ত্রণে বেলজিয়াম থেকে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দিল্লিতে যান আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা হাসান মাহমুদ এবং জাহাঙ্গীর কবির নানক। তারা ইফতার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তবে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি সেখানে অংশ নেননি। একই সঙ্গে আমন্ত্রিত অনেক সাংবাদিকও অনুষ্ঠানে যাননি। মূলধারার ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে কেবল ইন্ডিয়া টুডে–এর একজন সাংবাদিককে সেখানে দেখা গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সীমিত উপস্থিতিই অনুষ্ঠানটির গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক কিছু ইঙ্গিত করে।
বাংলাদেশের নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই অনুপস্থিতিকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে দুটি সম্ভাব্য বার্তা স্পষ্ট হতে পারে।
প্রথমত, ভারত সরকার সচেতনভাবেই এই আয়োজন থেকে দূরে থেকেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা হয়তো বোঝাতে চেয়েছে যে, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। বরং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখাই তাদের অগ্রাধিকার।
দ্বিতীয়ত, এটিকে আওয়ামী লীগের প্রতি একটি কূটনৈতিক দূরত্বের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একসময় দিল্লির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতি বেশ গুরুত্ব পেত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই দৃশ্যপটে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ফেসবুক পোস্টে এই ঘটনাকে আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের ‘বর্জনের মহড়া’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, অনুষ্ঠানে প্রত্যাশিত উপস্থিতি না থাকায় এটি রাজনৈতিকভাবে তেমন কোনো ইতিবাচক বার্তা দিতে পারেনি।
জুলকারনাইন সায়েরের ওই পোস্টে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কতটা আন্তরিক—তা ভবিষ্যতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে বোঝা যাবে। তিনি চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন:
১. বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা বা আটক করে নির্যাতনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা।
২. ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট–কে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা।
৩. ছাত্রনেতা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আটক ব্যক্তিদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা।
৪. দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ন্যায্য হিস্যা দেওয়া।
সব মিলিয়ে দিল্লির এই ইফতার অনুষ্ঠানটি প্রত্যাশিত রাজনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি বলে অনেকের ধারণা। বরং উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই এখানে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে দুই দেশের পারস্পরিক কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানের মধ্য দিয়েই।