যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় ইরানে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের দেশটি ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছে একাধিক দেশ।
এই সতর্কবার্তাগুলো এমন সময়ে দেওয়া হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তীব্র উত্তেজনা কমাতে কূটনীতিক ও মধ্যস্থতাকারীরা শেষ মুহূর্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন। জেনেভায় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকদের মধ্যে তৃতীয় দফার পরোক্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ইরানের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তেহরান এবং ইরানের কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম—যদিও এর পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। তবে তিনি কূটনৈতিক সমাধানকেই নিজের পছন্দ বলে উল্লেখ করেন।
ইরান বারবার বলেছে, ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী তারা শূন্য মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে রাজি হবে না। এছাড়া তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তারা ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করে, যা নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরীগুলোর দুটি—USS Abraham Lincoln এবং USS Gerald Ford—পাঠানো হয়েছে।
নিচে যেসব দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে, তাদের তালিকা দেওয়া হলো:
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়া সরকার বুধবার তাদের নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব ইরান ছাড়ার আহ্বান জানায়। তারা জানায়, আঞ্চলিক উত্তেজনা এখনও উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি আছে। ইরানে ভ্রমণ না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, কারণ সেখানে ইচ্ছাকৃত আটক ও অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির ঝুঁকি রয়েছে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লেবানন ও ইসরায়েলে কর্মরত কর্মকর্তাদের নির্ভরশীলদের সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে এবং জর্ডান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্বেচ্ছা প্রস্থানের সুযোগ দিয়েছে।
জার্মানি
জার্মান দূতাবাস জানিয়েছে, ইরান ও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির ও উত্তেজনাপূর্ণ। যেকোনো সময় উত্তেজনা বৃদ্ধি ও সামরিক সংঘর্ষ হতে পারে। বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ, ফ্লাইট বাতিল বা আকাশসীমা বন্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।
ভারত
নয়াদিল্লি সোমবার জানায়, শিক্ষার্থী, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীসহ সব ভারতীয় নাগরিক যেন সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং সম্ভব হলে ইরান ত্যাগ করেন।
পোল্যান্ড
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইরানে অবস্থানরত পোলিশ নাগরিকদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগ করার আহ্বান জানান এবং কাউকে সেখানে ভ্রমণ না করার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, সংঘাতের সম্ভাবনা খুবই বাস্তব এবং একসময় হয়ত সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
সার্বিয়া
সার্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের আপাতত ইরান ভ্রমণ না করার আহ্বান জানায় এবং যারা সেখানে আছেন, তাদের দ্রুত দেশ ছাড়তে বলে।
দক্ষিণ কোরিয়া
ইরানে অবস্থিত দক্ষিণ কোরিয়ার দূতাবাস এক নিরাপত্তা বার্তায় জানিয়েছে, দ্রুত বাড়তে থাকা আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার সতর্কতার প্রেক্ষাপটে, নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব ইরান ত্যাগ করা উচিত। যারা ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের সফর বাতিল বা স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুইডেন
সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনেরগার্ড সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ইরান ও আশপাশের অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত। তাই ইরানে সব ধরনের ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ এবং সেখানে অবস্থানরত সুইডিশ নাগরিকদের দ্রুত দেশ ছাড়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দূতাবাসটি সীমিত সংখ্যক প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ তাদের মিত্র ইরানের পক্ষে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র- আল জাজিরা