প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়:হাসপাতাল নির্মাণ, ওষুধ সরবরাহ, টিকাদান কর্মসূচি কিংবা চিকিৎসক নিয়োগ। কিন্তু এই বিপুল আলোচনার মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত থাকে একটি প্রশ্ন: মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আমরা কতটুকু বরাদ্দ রাখছি? উত্তরটি উদ্বেগজনক। দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্যে, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বরাদ্দের। বৈশ্বিক গড় বরাদ্দও ২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় বাংলাদেশের বরাদ্দ প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।

সমস্যার ব্যাপকতা: পরিসংখ্যান যা চোখ এড়িয়ে যায়

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন:সংখ্যায় যা দুই কোটির বেশি মানুষ। শিশুদের মধ্যেও প্রায় ১৩ শতাংশের মানসিক সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো চিকিৎসাই পান না। যারা সাহায্য খোঁজেন, তাদের একটি বড় অংশ প্রথমে যান কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের কাছে, এরপর সাধারণ চিকিৎসকের কাছে:মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছান সবার শেষে, যদি আদৌ পৌঁছান।

এই ব্যবধানের পেছনে রয়েছে জনবল সংকট। দেশে মাত্র কয়েকশ মনোরোগ বিশেষজ্ঢ় রয়েছেন, যাদের সংখ্যা প্রতি লাখ জনসংখ্যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ডের তুলনায় বহু গুণ কম। এর মধ্যে আবার বেশিরভাগ বিশেষজ্ঢ় ঢাকা শহরকেন্দ্রিক, ফলে গ্রামাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ কার্যত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে একেবারে হাত গুটিয়ে বসে নেই। ২০১৮ সালে শতবর্ষী পুরনো উপনিবেশিক আমলের উন্মাদ আইন বাতিল করে প্রণীত হয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮, যা রোগীর অধিকার সুরক্ষা ও চিকিৎসার মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এরপর প্রণীত হয়েছে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য নীতি ২০২২ এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০, যার লক্ষ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে একীভূত করা এবং চিকিৎসার ব্যবধান কমিয়ে আনা।

কিন্তু আইন আর কাগুজে পরিকল্পনা থাকলেই তা বাস্তবায়িত হয় না। বরাদ্দের অভাব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় পিছিয়ে থাকার কারণে এসব উদ্যোগ এখনো বড় পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট গড়ে ওঠেনি।

কেন এখনই অন্তর্ভুক্তি জরুরি

মানসিক স্বাস্থ্যকে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রকল্পের আওতায় আনার যুক্তি কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিকও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক রোগের বোঝার প্রায় ১৩ শতাংশের জন্য দায়ী মানসিক ও স্নায়বিক ব্যাধি। অচিকিৎসিত মানসিক রোগ কর্মক্ষমতা হ্রাস করে, উৎপাদনশীলতা কমায় এবং পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়:বিশেষত যখন চিকিৎসার ব্যয়ের সিংহভাগ রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। করোনা মহামারির সময় থেকেই মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইনভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

আসন্ন অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য চল্লিশ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং টিকাদান কর্মসূচির জন্যও বাড়তি অর্থ যুক্ত হয়েছে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবকাঠামো ও জনবল উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে। এই বৃহৎ পরিকল্পনার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে আলাদা ও দৃশ্যমান একটি স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কীভাবে অন্তর্ভুক্তি সম্ভব

বিশেষজ্ঢরা মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে মূলধারার স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যাতে রোগীকে শুধু ঢাকামুখী হতে না হয়। দ্বিতীয়ত, সাধারণ চিকিৎসক, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার, যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যা শনাক্ত হয়। তৃতীয়ত, মনোরোগ বিশেষজ্ঢ় ও মনোবিজ্ঢানী তৈরির জন্য মেডিকেল শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে জনবল সংকট দূর হয়।

এর পাশাপাশি, প্রকল্প বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান চালু করা যেতে পারে, যেমনটি টিকাদান বা মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আলাদা খাত হিসেবে বরাদ্দ থাকে। সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করে কুসংস্কার ও লজ্জার দেয়াল ভাঙার উদ্যোগও নিতে হবে, কারণ আজও বহু পরিবার মানসিক রোগকে গোপন রাখতে গিয়ে চিকিৎসা থেকে দূরে থাকে।

উপসংহার: বাজেট আলোচনার টেবিলে একটি নতুন আসন

স্বাস্থ্য মানে কেবল শরীরের সুস্থতা নয়:মনের সুস্থতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাতীয় বাজেট আলোচনায় যখন হাসপাতাল ভবন, এমআরআই মেশিন কিংবা ওষুধ সরবরাহের হিসাব কষা হয়, তখন একই টেবিলে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও একটি স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য বরাদ্দের দাবি তোলা প্রয়োজন। দুই কোটিরও বেশি মানুষের নীরব যন্ত্রণা আর কত দিন বাজেট বইয়ের প্রান্তিক টীকা হয়ে থাকবে, সে প্রশ্নের জবাব এখন নীতিনির্ধারকদেরই দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যকে মন্ত্রণালয়ের মূল প্রকল্প কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা তাই কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি কার্যকর, ন্যায়সংগত ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার পূর্বশর্ত।

তথ্যসূত্র: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২০-২০৩০, এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রসমূহ।

লেখক: টেকনিক্যাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট

অ্যাসোসিয়েট, বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্ক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews