চীনে কার্যকর হওয়া নতুন ‘জাতিগত ঐক্য’ আইন ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এই আইন কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বরং বিদেশে বসবাসকারী চীনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, অধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কানাডাভিত্তিক উইঘুর অধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনটি কার্যত সীমান্তের বাইরে বসবাসরত সমালোচকদের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি এবং আন্তঃদেশীয় দমন-পীড়নের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এদিকে, আইনটি নিয়ে কানাডার রাজধানী অটোয়ার প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই সংযত বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, বিদেশি সরকারগুলোর মাধ্যমে ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানি প্রতিরোধের যে অঙ্গীকার কানাডা অতীতে করেছে, এই ইস্যুতে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
জুলাই মাসের শুরু থেকে কার্যকর হওয়া এই আইনে বলা হয়েছে, চীনের বাইরে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের কর্মকাণ্ড যদি “জাতিগত ঐক্য” প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে অথবা রাষ্ট্রের সংজ্ঞায়িত জাতীয় সংহতির বিরুদ্ধে যায়, তাহলে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে। এই বিধান ভবিষ্যতে বিদেশে অবস্থানরত মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, সাংবাদিক কিংবা প্রবাসী উইঘুর, তিব্বতি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও বাস্তবে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে চীনের আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করা কতটা সম্ভব, তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে এমন আইনি কাঠামো প্রবাসীদের মধ্যে ভীতি তৈরির একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- Advertisement -
উইঘুর রাইটস অ্যাডভোকেসি প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক মেহমেত টোথি বলেন, নতুন আইনটি আন্তঃদেশীয় নিপীড়নের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। তার ভাষায়, চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। “চীনের বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া দিন দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ আরও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আন্তঃদেশীয় নিপীড়ন কিংবা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর বিষয়গুলো এখন আগের মতো আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে না।” টোথির মতে, বিদেশে থাকা উইঘুরদের অনেকেই ইতোমধ্যে নজরদারি, ভয়ভীতি এবং আত্মীয়-স্বজনকে চাপের মুখে ফেলার মতো ঘটনার অভিযোগ করেছেন। নতুন আইন সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বেইজিংয়ের দাবি, আইনটির মূল উদ্দেশ্য দেশের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয় ঐক্য সুসংহত করা এবং একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা। চীনে সরকারি হিসেবে ৫৫টি স্বীকৃত জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের মোট সংখ্যা দেশের প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ৯ শতাংশেরও কম। নতুন আইনে শিক্ষা ব্যবস্থায় মান্দারিন চাইনিজকে প্রধান ও বাধ্যতামূলক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সংবিধান ও আইনের আলোকে “চীনা জাতি” সম্পর্কে একটি অভিন্ন ধারণা গড়ে তোলাকে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই নীতির মাধ্যমে জাতীয় সংহতি আরও শক্তিশালী হবে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, আইনটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে উইঘুর ও তিব্বতি জনগোষ্ঠীর ওপর। এই দুই সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য অতীতে বেইজিংয়ের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে সেই আন্দোলন সহিংস রূপও নিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, নিরাপত্তার অজুহাতে চীন দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক নজরদারি, গণআটক, রাজনৈতিক পুনঃশিক্ষা কেন্দ্র এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আসছে। বিশেষ করে শিনজিয়াং অঞ্চলের উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা অতীতে সেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও চীন এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে, এসব পদক্ষেপ সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনের অংশ।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কানাডা অতীতে একাধিকবার বিদেশি রাষ্ট্রের মাধ্যমে ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ, নজরদারি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু চীনের নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর অটোয়ার প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা। তাদের দাবি, শুধু বিবৃতি নয়, বিদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপও প্রয়োজন।
চীনের নতুন “জাতিগত ঐক্য” আইনকে বেইজিং জাতীয় সংহতি জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বড় অংশ এটিকে ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের আরও একটি আইনি কাঠামো হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে আইনের বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি ও সংগঠনের ওপর সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। এই আইন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবাধিকার ইস্যু এবং বিদেশে বসবাসকারী চীনা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে চীনের নীতির সঙ্গে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংঘাত এখনও বহাল রয়েছে।
- Advertisement -