সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি দেশের উন্নত নীতিনির্ধারণ, দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি সুশাসন নিশ্চিতকরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও সংস্কার নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়াও এই সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশে সংসদে নারীর প্রকৃত উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত কম, যা শুধু লিঙ্গসমতার প্রশ্ন নয়; বরং সুশাসন ও নীতিনির্ধারণের মানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। প্রয়োগ উপযোগী গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নীতির মান উন্নত হয়, দুর্নীতি কমে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও হ্রাস পায়। মূলত নারীরা যখন সংসদে আসেন তখন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। Tracking analysis অনুযায়ী, নারী সংসদ সদস্যরা সাধারণত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি এবং শিশু ও মাতৃকল্যাণের মতো মৌলিক সামাজিক খাতগুলোতে বাজেট ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে বেশি জোর দেন। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নসংক্রান্ত প্রগতিশীল ও জেন্ডার-সংবেদনশীল আইন পাসে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চাহিদাগুলো নীতিনির্ধারণী টেবিলে সহজে স্থান পায়।
একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা (যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ডেটা) প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি হ্রাসের একটি সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। সংসদীয় কমিটিতে নারীর উপস্থিতি বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সাহায্য করে। নতুন নারী নেতৃত্বের আগমনে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ও অনানুষ্ঠানিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্কগুলো বাধাগ্রস্ত হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কমিয়ে আনে। তা ছাড়া সাধারণত নারীরা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কম ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন, যা রাজনৈতিক দুর্নীতি কমিয়ে আনে। তবে শুধু নারী হওয়ার কারণেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতিমুক্ত হবেন-এমন সরলীকরণ বাস্তবসম্মত নয়; দুর্নীতি মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আইনের প্রয়োগের ওপর। গবেষকদের মতে, নারীরা দীর্ঘকাল ক্ষমতার মূল বলয় থেকে দূরে থাকায় তাঁদের সম্পৃক্ততা কম দেখা গেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকলে ক্ষমতার নিজস্ব চরিত্র অনুযায়ী তাঁদের মধ্যেও বিচ্যুতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখতেও নারী নেতৃত্বের ভূমিকা অনন্য। নারীরা সাধারণত চরমপন্থা বা সংঘাতের চেয়ে আলোচনা, সমঝোতা এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বেশি পারদর্শী। যে রাষ্ট্রগুলোয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নাগরিক অস্থিরতার হার তুলনামূলক কম। নারী সংসদ সদস্যরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় যেখানে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি মূলত সামরিক, অবকাঠামো ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে নারী অংশীদারত্বমূলক রাজনীতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে এগিয়ে নেয়।
তাত্ত্বিকভাবে এই ধারণার মূল ভিত্তি আরও গভীরে প্রোথিত। কার্ল মার্কস এবং তাঁর দর্শনের অনুসারীরা বহু আগেই দেখিয়েছেন যে মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাসকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। তাঁদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয় যুগের ইতিহাসে ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতির কারণে পৃথিবীতে সংঘাত ও যুদ্ধের প্রবণতা অনেক কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমাজে যখন পুরুষতান্ত্রিকতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিবৈষম্য এবং বৈশ্বিক সংঘাতের মাত্রা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে আধুনিক সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমসাময়িক কোনো সংস্কার নয়, বরং এটি সমাজকে সেই আদিম সংঘাতহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস।
তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘সংখ্যার উপস্থিতি’ (Descriptive Representation) ও ‘অর্থবহ প্রভাব’ (Substantive Representation)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ রুয়ান্ডায় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের হার বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে (প্রায় ৬১ শতাংশ) হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা কিছুটা কর্তৃত্ববাদী হওয়ায় নীতিনির্ধারণে নারীদের স্বাধীন প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে উচ্চ নারী প্রতিনিধিত্ব এক অনন্য নাগরিকমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সংসদে কেবল নারীর সংখ্যা বাড়ালেই লক্ষ্য অর্জন হয় না, যদি না তাঁদের অর্থ বা প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফোরামে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা বা বিরোধীদলীয় নেতা পর্যায়ে নারীর নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্পিকারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে নারী অধিকার রক্ষা ও পলিটিক্যাল ইকোনমিকের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে, যা দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র চর্চার পথ সুগম করছে। তবে দেশীয় থিংক-ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি এবং প্রখ্যাত গবেষকদের সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু কাঠামোগত বাধাও উঠে এসেছে। আমাদের সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও এটি এখনো মূলত সংরক্ষিত আসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যেখানে সাধারণ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার হার ৫ শতাংশের নিচে। সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তাঁদের অনেক সময় ‘দ্বিতীয় শ্রেণির সংসদ সদস্য’ হিসেবে দেখার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রাজনীতিতে রয়ে গেছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্বের আইনি লক্ষ্যমাত্রা (৩৩ শতাংশ) অর্জনে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২.৩৩ শতাংশ।
এই কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু জটিলতা নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলের বিগত নির্বাচনগুলোতে সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হওয়ায়, রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে নারীর গুণগত ও প্রকৃত অংশগ্রহণের আসল চিত্রটি আড়ালেই রয়ে গেছে। যখন একটি নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোটাধিকার এবং অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ মার খায়, তখন সেখানে নারী প্রার্থীদের প্রকৃত জনসমর্থন বা স্বাধীন কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব উঠে আসার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তা এই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনি সংস্কৃতির কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা) নারীদের প্রকৃত, প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সামগ্রিক সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ স্থানীয় সরকারই হলো রাজনীতির মূল ভিত্তি; সেখানে যদি নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনের কোটা বা পুরুষ জনপ্রতিনিধিদের ছায়াতলে প্রতীকী নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করেন, তবে জাতীয় পর্যায়ে এর ইতিবাচক রূপান্তর আশা করা অবাস্তব। সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শ্রেণিগত বৈষম্য (যেখানে রাজনীতিতে আসা নারীদের বড় অংশই উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য) এবং নির্বাচনি প্রচারণায় নারীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সাইবার বুলিং ও হয়রানি রোধের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনি পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে সরাসরি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য হারে যোগ্য নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া, রাজনীতিতে আগ্রহী নারীদের সুরক্ষায় অনলাইন হেনস্তা কঠোর হস্তে দমন এবং নারী প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণার জন্য দলীয় তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়ার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনীতিকে কালোটাকা ও সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে এবং নারীদের মতো যোগ্য প্রার্থীদের অর্থনৈতিক সমতা দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন’ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাই বলা যায়, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার। বাংলাদেশ যদি সংরক্ষিত আসনের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অর্থবহ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ প্রকৃত অর্থেই বাড়াতে পারে, তবে দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল ও সংঘাতমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের সম্ভাবনা আরও দ্রুত গতিতে বাস্তবে রূপ নেবে। এর জন্য কেবল প্রতীকী অন্তর্ভুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নারী সংসদ সদস্যরা দলের অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সমঅধিকারসম্পন্ন প্রয়োজনে (১০০:১০০ হারে) অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।
লেখক : ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, অধ্যাপক (অব.) রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক