দেশের মুদ্রাবাজারে ঋণের বিভিন্ন উপকরণের সুদের হারে শৃঙ্খলা আনতে ‘রেফারেন্স রেট’ প্রকাশ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদ্রাবাজারে বিদ্যমান উপকরণের লেনদেনের সুদের হার পর্যালোচনা করে প্রতি কার্যদিবসে দুটি রেফারেন্স রেট প্রকাশ করা হবে। ১৫ এপ্রিল বুধবার থেকেই প্রকাশ করা হবে দুটি রেফারেন্স রেট। বিভিন্ন ধরনের ঋণচুক্তি, বন্ড, ভাসমান সুদের হারভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ও অন্যান্য আর্থিক চুক্তিতে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই রেফারেন্স রেট অনুসরণ করার জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে এখন থেকে আর ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো ঋণের সুদের হার নির্ধারণ বা বাড়াতে পারবে না। রেফারেন্স রেট অনুসরণ করে সুদের হার নির্ধারণ করতে হবে। এ পদ্ধতি অনুসরণের পর থেকে ঋণের বিভিন্ন উপকরণের সুদের হার কিছুটা হলেও কমতে শুরু করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এদিকে এদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এখন থেকে আর শুধু ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং প্রকৃত লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে মানি মার্কেটের সুদের হার। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী, ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের পরিচালক ইস্তেকমাল হোসেনসহ ডিপার্টমেন্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়, দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ঋণচুক্তি, বন্ড, ভাসমান সুদের হারভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ও অন্যান্য আর্থিক চুক্তিতে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক নির্দেশক হিসাবে কাজ করে বেঞ্চমার্ক রেট বা ভিত্তি সুদের হার। ব্যবহার উপযোগী, নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য বেঞ্চমার্ক নির্ধারণের লক্ষ্যে প্রকৃত লেনদেনের ভিত্তিতে প্রতি কার্যদিবসে বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি মানি মার্কেট রেফারেন্স রেট প্রকাশ করবে। প্রকাশিত রেট দুটির নাম হবে ‘বাংলাদেশ ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট’ (বিওএফআর) এবং ‘ঢাকা ওভারনাইট মানি মার্কেট রেট’ (ডিওএমএমআর)। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে এই রেফারেন্স রেট দুটি প্রকাশ করা হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবপেজে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রাহকদের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ঋণচুক্তি, বন্ড, ভাসমান সুদের হারভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের উপকরণের চুক্তি বা লেনদেনের ক্ষেত্রে রেফারেন্স রেট দুটি অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য আর্থিক চুক্তির ক্ষেত্রেও সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে রেফারেন্স রেট ভিত্তি হিসাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ডলারের লেনদেনের ক্ষেত্রে আগের দিনের লেনদেন বিশ্লেষণ করে প্রতি কার্যদিবসে রেফারেন্স রেট প্রকাশ করছে। ব্যাংকগুলোকে ডলারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই রেফারেন্স রেটের আশপাশে থাকতে হচ্ছে। আগের মতো ইচ্ছামতো ব্যাংকগুলোর ডলারের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। মুদ্রা বাজারের জন্য আলোচ্য দুটি রেফারেন্স রেট প্রকাশ করা হলে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন উপকরণের সুদের হার নিরূপণের ক্ষেত্রে রেফারেন্স রেটের আশপাশে থাকতে হবে। তখন তারা ইচ্ছামতো ঋণের সুদের হার বাড়াতে পারবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সুদের হার নিরূপণের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। যে কারণে ভালো ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতের সুদের হার কম হলেও ঋণের সুদের হার কম নয়। বরং বেশিই রাখে। অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার যেমন বেশি রাখে, তেমনি ঋণের সুদের হারও বেশি রাখে। ফলে ভালো ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংকগুলোর বাড়তি সুদের এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেরাও বেশি সুদ আদায় করে। এ ধরনের প্রবণতা রোধে ও সুদের বাজারে শৃঙ্খলা আনতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে ঋণচুক্তির ক্ষেত্রে বর্তমানে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের তৈরি লাইবর বা লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের (এফআরবি) তৈরি করা সোফর বা সিকিউরড ওভারনাইট ফিন্যান্সিং রেট অনুসরণ করা হয়। ঋণচুক্তির ক্ষেত্রে এর আশপাশে অর্থাৎ কিছু বাড়তি ধরে সুদের হার নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের পদ্ধতি চালু করতে চাচ্ছে। এতে ঋণ গ্রহীতারা আগে থেকেই ঋণের সুদের হার সম্পর্কে একটি অনুমান পেতে পারবেন।