ডা: মো: এনামুল হক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন পর্বের সূচনা করেছে। সংখ্যার বিচারে এটি ছিল বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন। ৫১টি দল অংশ নিলেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছে মাত্র ৯টি দল। এর মধ্যে চারটি ইসলামী দল মোট ৭২টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু এ সংখ্যাগত সাফল্যের আড়ালে যে বাস্তবতা প্রচ্ছন্ন, তা হয়তো আরো গভীর, আরো শিক্ষণীয়।
ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনে ঐক্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না’। এই ঐক্যের বাণী শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশ নয়; সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনেও এর তাৎপর্য অপরিসীম। এবার নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ইসলামী দলগুলোর এক বাক্স নীতি, ন্যায় ও ইনসাফের প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান বহু মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। তারা ভেবেছিলেন, অন্তত ইসলামপন্থীরা নীতিগত প্রশ্নে এক কাতারে দাঁড়াবেন। কিন্তু নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়, জোট ভাঙে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপড়েন শুরু হয়। পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের রাজনীতি তুঙ্গে ওঠে। এর বিপরীতে এ নির্বাচনে আরেকটি ইতিবাচক দিকও সামনে এসেছে। কিছু দল ও ব্যক্তি ইসলামী পরিচয় বহন না করেও ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। আধিপত্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, কোনো আসন দাবি বা ক্ষমতার শর্ত ছাড়া। এতে প্রমাণ হয়েছে, আদর্শ কেবল নামে নয়; বরং নীতিগত অবস্থান ও আচরণের মধ্যে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হয়।
২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামী ১৭টি এবং ২০০৮ সালে দু’টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবার বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রেক্ষাপটে জামায়াতের পাশাপাশি আরো দু’টি ছোট ইসলামী দল সংসদে প্রবেশ করেছে। সংখ্যায় এটি অগ্রগতি; কিন্তু পদ্ধতিতে ছিল বিচ্ছিন্নতার ছাপ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ‘রিকশা’ প্রতীকে ২০ আসনে লড়ে দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে; ‘দেয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে ১০টির মধ্যে একটি আসনে সাফল্য পেয়েছে। নেজামে ইসলাম পার্টি দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটিতেও জিততে পারেনি। অন্যদিকে, হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১১ দলীয় জোটের সাথে সমঝোতা না হওয়ায় ১৪৩ আসনে, ‘এ গ্রেড’ মানের প্রার্থী দেয়ার ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে প্রচার চালালেও শেষ পর্যন্ত মাত্র একটি আসনে বিজয় পেয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতার বিচারে এটি শুধু কৌশলগত ব্যর্থতা নয়; আত্মসমালোচনারও বিষয়।
কিছু আসনের ফল এই বিচ্ছিন্নতার মূল্য কতটা চড়া ছিল, তা স্পষ্ট করে। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোটের এনসিপি প্রার্থী পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৬১৬ ভোট এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৯৬৮ ভোট। দু’টি ইসলামপন্থী শক্তির ভোট যোগ করলে তা বিজয়ীর চেয়ে বেশি হতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে তিনটি ইসলামী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়েছে; ফলত বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এমন উদাহরণ অসংখ্য। প্রশ্ন জাগে, এই ভোটগুলো কী কেবল পরাজিত প্রার্থীদের, নাকি একটি সম্ভাব্য ঐক্যেরও?
আসন ভাগাভাগির প্রশ্নে লোভ ও স্বার্থপরতার অভিযোগ উঠেছে। অথচ এর ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়েছেন সাধারণ দলের কেউ কেউ। ১১ দলীয় জোটে অবস্থানকালে যে সহনশীলতার ভাষা উচ্চারিত হয়েছে, জোট থেকে বেরিয়ে এসে তার উল্টো সুর শোনা গেছে। জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে কেউ কেউ একটি ইসলামী দলের বিরুদ্ধে ফতোয়ার ভাষায় প্রচারণা চালিয়েছেন। কাউকে ভোট দেয়া হারাম ঘোষণা পর্যন্ত হয়েছে। আবার যারা দীর্ঘদিন গণতন্ত্রকে কুফরি বলে সমালোচনা করেছেন, তাদের কিছু অংশ অতীতে এবং এবারো প্রকাশ্যে মানব রচিত মতবাদ প্রতিষ্ঠায় রত, সেক্যুলার শক্তিকে সমর্থন দিয়েছেন। এই দ্বৈততা সাধারণ মানুষের চোখ এড়ায়নি।
আশার কথা, প্রচলিত ইসলামপন্থী দলের নেতা-পীরদের নির্দেশ অনুসারীরা অন্ধভাবে মানেননি। ভোটের সংখ্যায় তা স্পষ্ট। জনগণ আজ রাজনৈতিকভাবে সচেতন; তারা দলকানা নন। তারা বুঝতে পেরেছেন, ন্যায়ের ভাষণ আর বাস্তব রাজনীতির আচরণ এক না হলে তার মূল্য দিতে হয়। ফলে ২০২৬-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন শুধু কিছু প্রার্থী নন; বিজয়ী হয়েছেন সাধারণ ভোটার, যারা দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ প্রেক্ষাপটে ‘নৈতিক পরাজয়’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক ইসলামপন্থী নৈতিকতার প্রশ্নে উত্তীর্ণ হতে পেরেছেন কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তারা ঐক্যের শিক্ষা উপেক্ষা করে পরস্পরকে আক্রমণ করেছেন। ফলে রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। রাজনীতিতে মতভেদ থাকবে; কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, কুৎসা ও বিভাজনে রূপ নিলে তা ইসলামের নৈতিক আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের রাজনীতি এক সঙ্কটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, সামাজিক মেরুকরণ, বৈশ্বিক চাপ, সব মিলিয়ে জাতির জন্য প্রয়োজন ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক শাসন। ইসলামপন্থীরা যদি সত্যি এই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের প্রথম কাজ হবে আত্মসমালোচনা। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রাধান্যের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। ঐক্য মানে একরূপতা নয়; বরং অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে সহনশীল সহাবস্থান। ২০২৬-এর নির্বাচন তাই শুধু আসনসংখ্যার হিসাব নয়; এটি একটি আয়না, যেখানে ইসলামপন্থীরা নিজেদের মুখ দেখতে পারেন। তারা চাইলে এই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে পারেন— যেখানে ভিন্নমত থাকবে; কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না, প্রতিযোগিতা থাকবে; কিন্তু পরস্পরকে ধ্বংসের মানসিকতা থাকবে না। আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করার অর্থ হলো ন্যায়ের প্রশ্নে এক হওয়া। জাতি আজ সেই আহ্বানের অপেক্ষায়। যদি ইসলামপন্থীরা পারস্পরিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হন, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার দেন, তবে ২০২৬-এর নির্বাচনী ফল একদিন তাদের প্রকৃত জাগরণের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক