বিশ্বজুড়ে রাইড শেয়ারিং এবং গিগ ইকোনমি কোটি কোটি মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের অন্যতম বড় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। উবার, লিফট, গ্র্যাব, বল্ট, দিদি, র্যাপিডো, ইনড্রাইভ কিংবা পাঠাওয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিশ্বজুড়ে পরিবহণের ধরন যেমন বদলে দিয়েছে, তেমনি কাজের ধারণাতেও পরিবর্তন এনেছে। ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে চার চাকার পাশাপাশি দুই চাকার বাইক শেয়ারিং অত্যন্ত জনপ্রিয়। পূর্ণকালীন চালকদের পাশাপাশি পার্টটাইম হিসেবেও তরুণ শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরাও এ পেশায় যুক্ত হয়ে টাকা উপার্জন করছেন।
তবে পার্ট-টাইম রাইড শেয়ারিং করে কিভাবে বেশি আয় করা যায় সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার গল্প তুলে ধরেছেন ভারতের বেঙ্গালুরুর এক কলেজ শিক্ষার্থী। রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম র্যাপিডোর চালক হিসেবে তিন মাস কাজ করেছেন তিনি। এই সময়ের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে নজর কেড়েছেন বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী।পাশাপাশি তিনি কিছু চালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, অ্যালগরিদম ও গিগ ইকোনমি (অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক অর্থনীতি) কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য কলেজ ছুটির সময়ে তিনি বাড়তি আয়ের অংশ হিসেবে এই কাজ শুরু করেন। শুরুতে প্ল্যাটফর্মটির কার্যপদ্ধতি পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও দ্রুতই তিনি ধরে ফেলেন কোন এলাকাগুলোতে রাইডের চাহিদা বেশি থাকে, যা পরবর্তী সময়ে তার আয় বাড়াতে সাহায্য করে।
ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সাধারণত সকাল ৮টায় কাজ শুরু করে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চালাতেন। জ্বালানি বা অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে ভালো একটি দিনে তার আয় হতো প্রায় ১ হাজার ২০০ রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫৩৬ টাকা)।
তিনি লেখেন, ‘আমার জন্য এটি আসলেই খুব ভালো একটি পার্ট-টাইম কাজ ছিল। কিন্তু এটি আমাকে এমন মানুষদের কথাও অনেক ভাবিয়েছে, যাদের পুরো জীবিকাই এ ধরনের গিগ কাজের ওপর নির্ভরশীল। ওই সময়টায় কাজের ফাঁকে আমি কার্যত কোনো বিরতিই নিতাম না।’
বিকালের দিকে যখন রাইডের সংখ্যা কমে যেত, তখন আয় বাড়াতে তিনি খাবার সরবরাহের (ফুড ডেলিভারি) কাজও করতেন।
তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো খাবার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি পাওয়া যায়। আবার কখনো খাবার তৈরি হওয়ার জন্য ২০ থেকে ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।’
টানা তিন মাস তিনি বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় নিয়মিত রাইড সেবা দিয়েছেন। তিনি জানান, অটোরিকশাচালকরা তার দিকে কিছুটা বাঁকা চোখে তাকালেও কেউ তাকে হুমকি দেননি বা কোনো ঝামেলায় জড়াননি।
আয়ের প্রমাণ হিসেবে তিনি তার অ্যাপের ড্যাশবোর্ডের স্ক্রিনশটও শেয়ার করেছেন। গত মে মাসে তিনি ৯৬টি ট্রিপ সম্পন্ন করে আয় করেন ৫ হাজার ৬৫০ রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ হাজার ২৩২ টাকা)। জুন মাসে তার আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৬০ রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় ২১ হাজার ৩২৪ টাকা)। এরপর জুলাই মাসে ২৩৩টি ট্রিপ সম্পন্ন করে ১৪ হাজার ২২২ রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮ হাজার ২০২৪) আয়ের মাধ্যমে তিনি এই কাজের ইতি টানেন।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিষয়টি কেবল প্রতিদিনের ১ হাজার ২০০ রুপি আয়ের ছিল না। একজন শ্রমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে গিগ কাজের বাস্তব রূপ কেমন—তা আমি দেখতে পেরেছি। দীর্ঘ অপেক্ষা, জ্বালানি খরচ, অনিশ্চয়তা, প্ল্যাটফর্মের নানা নিয়মকানুন, গ্রাহকদের সমস্যা, রেস্তোরাঁর নানা জটিলতা এবং সারাক্ষণ ছুটতে থাকার মানসিক চাপ খুব কাছ থেকে অনুভব করেছি।’
পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা নিজের অভিজ্ঞতার এমন বিশদ ও বাস্তবভিত্তিক বিবরণ তুলে ধরার জন্য ওই শিক্ষার্থীর প্রশংসা করেন।
একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘অসাধারণ পোস্ট, আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।’ আরেকজন লেখেন, ‘পুরো অভিজ্ঞতাকে আপনি ইতিবাচক ও শিক্ষণীয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখলে মাটিতে পা রেখেই আপনি অনেক দূর এগিয়ে যাবেন।’
তৃতীয় একজন মন্তব্য করেন, ‘খুবই চমৎকার পর্যবেক্ষণ। ধন্যবাদ। এ ছাড়া ক্যাশ অন ডেলিভারিতে যারা খাবার বা পণ্য অর্ডার করেন, দয়া করে আগে থেকেই টাকা গুছিয়ে রাখুন। ডেলিভারিম্যান আসার পর টাকা খুঁজতে যাবেন না কিংবা দরজা খুলতেই পাঁচ মিনিট সময় নষ্ট করবেন না। বিশেষ করে গিগ কর্মীদের কাছে সময়ের মূল্য অনেক বেশি।’
চতুর্থ এক ব্যক্তি লেখেন, ‘বিবিএ পড়ার সময় আমিও এমনটা করেছিলাম। কেউ আমাকে কোনো ঝামেলায় ফেলেনি। আমি সকালে ৭টা থেকে ১১টা এবং বিকালে ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করতাম। ইনসেনটিভসহ দৈনিক প্রায় দেড় হাজার রুপি আয় করতাম। পরে অবশ্য ছেড়ে দিয়েছি।’
সূত্র: এনডিটিভি