জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য বোঝা না সম্পদ- এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই একবাক্যে বলবেন সম্পদ। কিন্তু অতিরিক্ত জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য অনেক সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণই কী সমস্যার সমাধান? যদি উত্তর হ্যাঁ হয় তাহলে চীন এখন কেন এক সন্তান নীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিন সন্তান নীতি গ্রহণ করেছে? স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সব সরকারই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে চেয়েছে এবং সাফল্যের সাথে তা করতেও পেরেছে। এটা চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছর পর বাংলাদেশও নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে, যার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।

আধুনিক বিশ্বে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে যতটা আলাপ-আলোচনা হয় তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ নিয়ে। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক সুবিধা, যা কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তৈরি হয়। সহজ কথায়, যখন কোনো দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি মানুষের সংখ্যা শিশুদের (০-১৪) এবং বয়স্কদের (৬৫+) চেয়ে বেশি হয়, তখন সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে। এ হিসেবে বাংলাদেশ এখন বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। জনসংখ্যার এমন মারপ্যাঁচের হিসাব আর নানা আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রতিবছর ১১ জুলাই এ দিবসটি পালিত হয়। এবার বিশ্বব্যাপী দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য হলো: ‘তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’ (Realizing the hopes and aspirations of young people – today and for the future)।

বিভিন্ন সমস্যা এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯০ সাল থেকে জনসংখ্যা দিবস নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। ১৯৮৭ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ৫ বিলিয়ন স্পর্শ করায়, ‘ফাইভ বিলিয়ন ডে’ (Five Billion Day) পালনের অনুপ্রেরণা থেকেই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ১৯৮৯ সালে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করে। ২০১১ সালে ৭ বিলিয়নে আর ২০২২ সালের নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখে বিশ্বে জনসংখ্যা পৌঁছে যায় ৮ বিলিয়নে।

বিশ্বে একাধিক শিশু জন্ম নেওয়ার কারণে নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট করে কারও পক্ষেই ৮ বিলিয়নতম শিশু শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তবে, জাতিসংঘের আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী, ফিলিপাইনের ম্যানিলা শহরে জন্ম নেওয়া ভিনিস মাবানসাগ নামের শিশুকন্যাকে প্রতীকীভাবে ৮ বিলিয়নতম মানবশিশু হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর স্থানীয় সময় রাত ১টা ২৯ মিনিটে ফিলিপাইনের ম্যানিলার ড. হোজে ফাবেলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে তার জন্ম হয়। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকারও দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আলোচনা সভা, র‌্যালি এবং সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে সব সরকারই বিভিন্ন পরিকল্পনা, কর্মকৌশল, নীতি গুরুত্বের সাথে হাতে নিয়েছে। প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রথম আদমশুমারি হয়। তাতে দেখা যায়, দেশের মোট জনসংখ্যা ৭ কোটি ৬৪ লাখ। ৭ বছর পর আবারও আদমশুমারি হয়, যেখানে দেখা যায় এই সাত বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে এক কোটি সাত লাখ। পরের দশ বছরে বেড়েছে প্রায় আড়াই কোটি। অবশ্য ১৯৯১ সালের পর থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমতে থাকে। সে সময় সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতার পাশাপাশি নানামুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিলো।

লেখার শুরুর দিকে বলেছিলাম, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের হিসাবে বাংলাদেশ এখন বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর্মক্ষম, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরের। বর্তমানে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। এসব তথ্য বেশ স্বস্তিদায়ক। ২০০০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের (১৫ থেকে ৬৪ বছর) সংখ্যা ছিল ৫৯ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৬৬ শতাংশ। গবেষণায় বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে। কিন্তু তারপর থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করবে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে থাকবে আর বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। ২০৩০ এ পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষ ২২ শতাংশ হলেও ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৩৫ শতাংশে। আর ২০৩০ সালে ৬৫ বছরের বেশি মানুষের সংখ্যা হবে ৭ শতাংশ আর ২০৫০ সালে তা দাঁড়াবে ১৬ শতাংশে।
জাতিসংঘ ও জনসংখ্যা নিয়ে গবেষণা করে এমন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া এসব তথ্য আমাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। এখানে মূল চ্যালেঞ্জ ২টি; বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষদের কীভাবে কাজে লাগানো যায় আর ভবিষ্যতে বয়স্ক মানুষদের ভালো রাখতে কী ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হবে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান তৈরি ও জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলো। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো: এসব উদ্যোগ মূলত একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে। যুব সমাজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির একটি বড় পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান এক দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীত করা এবং পাঁচ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপি সরকারের। একই সঙ্গে ‘ওয়ান-ভিলেজ, ওয়ান-প্রোডাক্ট’ বা ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় অঞ্চলভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনৈতিক পণ্যের প্রসারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। এছাড়াও, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল সার্ভিসিং, কেয়ারগিভিং এবং ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। আগামী ৫ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বল্পব্যয়ী নিয়োগ ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ সহজতর করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA) ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য গবাদিপশু পালন, কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে মাইক্রোক্রেডিট প্রদান করা হচ্ছে। এসব পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন করা গেলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ অর্জন করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে উদ্বেগের বিষয় আরও একটা থেকেই যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.২২ শতাংশ। জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৬১ সালে বাংলাদেশের এ হার হবে ০.০১ শতাংশ। এরপর থেকেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও কমে যাবে। ২০৬২ সালে এ হার হবে ০.০২ শতাংশ। তখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে আর হুঁ হুঁ করে বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ফলে উৎপাদন কমে যাবে, সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে, কিন্তু বয়স্ক মানুষের জন্য সরকারের খরচ বেড়ে যাবে। এ চাপ সামাল দেওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে পড়বে তখনকার সরকারের ওপর। বিষয়টি নিয়ে এখনি নতুন করে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

এ আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই চীন এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নীতি পরিবর্তন করেছে। ১৯৭৯ সালে এক সন্তান নীতি চালু করেছিল চীন। তবে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২১ সালে দম্পতিদের তিনটি পর্যন্ত সন্তান নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৪ সাল থেকে পরিবারগুলোতে সন্তান সংখ্যার আইনি সীমাবদ্ধতা শিথিল করা হয়েছে।

জনসংখ্যা, জনসংখ্যা নীতি, জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ: এমন নানা জটিল হিসাব কষে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়াই সবচেয়ে জরুরি। তাইতো এবারে জনসংখ্যা দিবসের মূল স্লোগান ‘তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’। এ স্লোগানের মর্মার্থ বুঝে তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করা সময়ের দাবি। বর্তমান তরুণ সমাজ একটি বৈষম্যহীন সমাজ চায়, যেখানে সবার কাজের অধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন মূলত এ অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিলো। তরুণদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলে ২০৫০ সালের পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে যেসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে তা দূর হবে।

লেখক: চিফ ফিচার রাইটার, তথ্য অধিদফতর



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews