নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চলছে এখন ঠিক আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই। অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মীয়করণের বেড়াজালে পরিবেশবান্ধবহীন নিম্নমানের শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থী সংকটের তথ্য গোপন করে জোড়াতালি দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে বিভিন্ন কেন্দ্র। পুরো উপজেলার ধর্মীয় এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে অনিয়ম ও প্রতারণার আশ্রয়ের ভয়াবহ চিত্রের অভিযোগ উঠেছে। এভাবেই পরিচালিত হচ্ছে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মসজিদভিত্তিক এই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। অভিযোগের তীর ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপার ভাইজার মোহাম্মদ মুসার অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতায় পরিচালিত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, পক্ষপাতমূলক আচরণসহ দুর্নীতির বেড়াজালে পড়ে কার্যক্রম ভেস্তে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এদিকে জেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঠিক তদারকির অভাবে দিন দিন ফিল্ড সুপারভাইজার মুসার অনিয়মের মাত্রা বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন একাধিক শিক্ষকসহ স্থানীয়রা। সরজমিন লোহাচুড়া পশ্চিম পাড়া কাচারিতে গেলে দেখা যায়Ñছাগল ও হাঁস-মুরগির থাকার ঘরের উপরে স্থাপিত কাজল রেখা নামক একজন শিক্ষক ৩০ জনের স্থলে ৮ জন শিশু নিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়মবহির্ভূতভাবে পড়ানো হচ্ছে। বড়গাছা ইউনিয়নের মালশন বড়পুকুরিয়া বাজার জামে মসজিদ, জয়সার জামে মসজিদ, টংকুড়ি আমজাদ হোসেন টিয়ার কাচারি নামক মসজিদভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায় হতাশাজনক চিত্র। ৩০-৩৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৬ জনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। নুসরাত জাহান সূচি কালিগ্রাম ইউনিয়নের আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রে শিক্ষক হিসেবে চাকরি করলেও এই বছরের তালিকায় তার নামের পাশে খট্রেশ্বর ইউনিয়নের আসমাইল হাজীর কাচারি নামক কেন্দ্র দেখানো হয়েছে। আসমাইল হাজীর কাচারি কেন্দ্রটি খট্টেশ্বর ইউনিয়নে দেখানো হলেও বাস্তবে ওই কেন্দ্রের অবস্থান কাশিমপুর ইউনিয়নে, যা আরও তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও বছরের পর বছর বেতন-ভাতা উত্তোলন করছে। কোথাও কোথাও কেন্দ্রের বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার কোথাও কোথাও ইচ্ছে মতো কেন্দ্র পরিবর্তন করে পাঠদান করানো হচ্ছে। কাগজ কলমে শিক্ষা কেন্দ্রগুলো দেখানো হলেও বাস্তবে শিক্ষা কার্যক্রম ও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে শতকরা ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী না থাকলে সেই কেন্দ্র চলার অনুপযোগী। কিন্তু আবু মুসার অধীনে থাকা বেশ কিছু কেন্দ্রের বাস্তবতা উল্টো। প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রে ৩০ জন, সহজ কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমে ৩৫ জন ও বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। বাস্তবে অনেক কেন্দ্রে ১০ জনের নিচে শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া বিগত বছরের পুরাতন শিক্ষার্থী এনে হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখানো হয়। এ ছাড়া সহজ কোরআন শিক্ষা সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এবং সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক কেন্দ্রে শিশুদের পাঠদান করানোর কথা। কিন্তু যে যার ইচ্ছা মতো শিক্ষা কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে। এদিকে কর্মরত শিক্ষক ও কেন্দ্রের নামের একটি তালিকা আসে এই প্রতিবেদকের হাতে। গত বছরগুলোতে নুসরাত জাহান সূচি আমগ্রাম জামে মসজিদ কেন্দ্রের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করলেও এই বছর তার নামের পাশে আসমাইল হাজীর কাচারি নামক কেন্দ্র দেখানো হয়েছে। আসমাইল হাজীর কাচারি কেন্দ্রটি খট্টেশ্বর ইউনিয়নে দেখানো হলেও বাস্তবে ওই কেন্দ্রের অবস্থান কাশিমপুর ইউনিয়নে। সরজমিন গেলে সাবেক শিক্ষার্থীর মা মোসা. মর্জিনা বেগম বলেনÑএখানকার শিক্ষার কার্যক্রম আরও তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে জানতে শিক্ষক সূচিকে মুঠোফোনে কল দিলে রিসিভ করে কথা বলেনি। শিক্ষক কাজল রেখা মুঠোফোনে বলেনÑ২০১৪ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরিতে যোগদান করে কেন্দ্র চালাচ্ছি। আমার একটা সুনাম আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেনÑজেলার সংশ্লিষ্টদের তদারকি না থাকায় ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ আবু মুসার স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বে অবহেলা দিন দিন বেড়ে গেছে। ফলে এই প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার্থীরা। উপজেলার ফিল্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ মুসা মুঠোফোনে বলেনÑআমি ফোনে মন্তব্য করতে বা তথ্য দিতে রাজি না। আপনি অফিসে আসেন। যা জানার জানতে পারবেন। উপজেলার কেন্দ্রগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকলেও সঠিকভাবে তদারকি করেন না জেলার ফিল্ড অফিসার মো. তাওফিকুর রহমান। মুঠোফোনে জানতে চাইলে দায়সারা জবাব দিয়ে মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন। নওগাঁর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মো. মারুফ রায়হান মুঠোফোনে বলেনÑকেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাকিবুল হাসান দৈনিক মানবজমিনকে বলেন-ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কাম্য সংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত অর্থবছরে থাকা ৮৯টি কেন্দ্র যাচাই করে ৭৪টি কেন্দ্র চলমান রয়েছে।