দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পানীয় শিল্পের সাফল্যের মূল সূত্র ছিল মোটামুটি একই। কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করত বিজ্ঞাপনে, শক্তিশালী পরিবেশক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলত, সুপারমার্কেটের আকর্ষণীয় শেলফে স্থান নিশ্চিত করত, বিভিন্ন ক্রীড়া ও সামাজিক অনুষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং ভোক্তাদের কাছে নিজেদের ব্র্যান্ডকে প্রথম পছন্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরন্তর প্রতিযোগিতা করত। কোমল পানীয়, ফলের রস, বোতলজাত পানি কিংবা এনার্জি ড্রিংক— যে পণ্যই হোক না কেন, বাজারে সফল হওয়ার প্রধান চাবিকাঠি ছিল খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে দৃশ্যমান উপস্থিতি, কার্যকর বিজ্ঞাপন এবং শক্তিশালী বিতরণ ব্যবস্থা।
কিন্তু বিশ্বের খাদ্য ও পানীয় শিল্পে এখন নীরবে আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। ক্রমেই ভোক্তারা সুপারমার্কেটের তাক ঘুরে দেখা বা গুগলে সাধারণ সার্চ করার পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) প্ল্যাটফর্ম— যেমন ChatGPT, Google Gemini, Claude, Microsoft Copilot এবং Perplexity ব্যবহার করে জানতে চাইছেন, ‘সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর এনার্জি ড্রিংক কোনটি?’, ‘অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কোন পানীয় ভালো?’, ‘দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ভালো কোলাজেন ড্রিংক কোনটি?’ অথবা ‘কম চিনি-যুক্ত স্বাস্থ্যকর হাইড্রেশন ড্রিংক কী?’ ধীরে ধীরে এআই ভোক্তাদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ও পরামর্শদাতায় পরিণত হচ্ছে। ফলে পানীয় শিল্পে তৈরি হচ্ছে এক নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে ব্র্যান্ডগুলো আর শুধু ভোক্তাদের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে না; বরং তারা প্রতিযোগিতা করছে এআই-এর সুপারিশের তালিকায় স্থান পাওয়ার জন্য।
এক গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সাধারণ ভোক্তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ChatGPT, Gemini, Claude এবং অন্যান্য এআই প্ল্যাটফর্ম কীভাবে বিভিন্ন ফাংশনাল বেভারেজ ব্র্যান্ডের নাম সুপারিশ করে। গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, এআই কোনো ব্র্যান্ডকে শুধুমাত্র তার বাজার দখল বা বিক্রির পরিমাণের ভিত্তিতে সুপারিশ করে না। বরং যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত, নির্ভরযোগ্য এবং ধারাবাহিক তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে, এআই তাদের সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে ভালো ধারণা তৈরি করতে পারে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সেই ব্র্যান্ডকে সুপারিশ করে।
অর্থাৎ, এআই কেবল জনপ্রিয় ব্র্যান্ডকে নয়, বরং যে ব্র্যান্ড নিজেদের সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, তাদেরই বেশি গুরুত্ব দেয়। কোনো পণ্যের উপাদান, উৎপাদনের উদ্দেশ্য, পুষ্টিগুণ, বৈজ্ঞানিক তথ্য, শিক্ষামূলক নিবন্ধ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যের ধারাবাহিকতা— এসবই এআই-এর কাছে একটি ব্র্যান্ডকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
গবেষণাটি ভোক্তাদের অনুসন্ধান করার ধরনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আগে মানুষ ‘এনার্জি ড্রিংক’ খুঁজত, এখন তারা খুঁজছে ‘স্বাস্থ্যকর এনার্জি ড্রিংক’। আগে ‘সফট ড্রিংক’ খুঁজলেও এখন তারা জানতে চাইছে ‘গাট হেলথ সোডা’, ‘হেলদি সোডা’, ‘ডেইলি ওয়েলনেস ড্রিংক’, ‘উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ পানীয়’ কিংবা ‘বিউটি ড্রিংক’ সম্পর্কে। অর্থাৎ মানুষ এখন কোনো নির্দিষ্ট পানীয়ের নাম নয়, বরং তাদের স্বাস্থ্যগত বা জীবনধারাভিত্তিক প্রয়োজনের সমাধান খুঁজছে। এআই এই উদ্দেশ্যগুলো বুঝে সবচেয়ে উপযুক্ত পণ্য বা ব্র্যান্ডের সুপারিশ করার চেষ্টা করে।
এ কারণেই Celsius, Olipop, Poppi, AG1, Liquid Death, Gatorade এবং Prime-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো AI Visibility Index-এ উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে। যদিও এরা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পানীয় তৈরি করে, প্রত্যেকটি ব্র্যান্ড তাদের নিজস্ব পরিচয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। Celsius নিজেকে শুধু আরেকটি এনার্জি ড্রিংক হিসেবে নয়, বরং স্বাস্থ্যসচেতন ও ফিটনেসমুখী মানুষের জন্য একটি কার্যকর পানীয় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। Olipop ও Poppi নিজেদেরকে অন্ত্রের স্বাস্থ্যবান্ধব এবং প্রচলিত কোমল পানীয়ের স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। Gatorade ক্রীড়াবিদদের হাইড্রেশনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত, অন্যদিকে AG1 নিজেকে একটি দৈনন্দিন ওয়েলনেস ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমনকি Liquid Death, যদিও মূলত বোতলজাত পানি বিক্রি করে, তবুও সাহসী ব্র্যান্ডিং, গল্প বলার কৌশল এবং শক্তিশালী মিডিয়া উপস্থিতির মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠান কেবল পানীয় বিক্রি করেনি; তারা এমন একটি গল্প তৈরি করেছে যা ভোক্তার নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজারে সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড হওয়া মানেই এআই-এর প্রথম পছন্দ হওয়া নয়। উদাহরণ হিসেবে, Red Bull বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এনার্জি ড্রিংক ব্র্যান্ড হলেও, যখন কেউ ‘স্বাস্থ্যকর এনার্জি ড্রিংক’ সম্পর্কে জানতে চায়, তখন এআই অনেক ক্ষেত্রেই Celsius-এর নাম সুপারিশ করে। কারণ, Celsius বহু বছর ধরে নিজেকে স্বাস্থ্য, ফিটনেস এবং কার্যকর পুষ্টির সঙ্গে যুক্ত করে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করেছে। অর্থাৎ এআই জনপ্রিয়তার চেয়ে প্রাসঙ্গিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ভোক্তার প্রশ্নের সঙ্গে যে ব্র্যান্ড সবচেয়ে ভালোভাবে মিলে যায়, এআই সেটিকে অগ্রাধিকার দেয়।
যদিও AI Visibility Index-এর গবেষণা যুক্তরাজ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে, একই প্রবণতা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং কানাডার বাজারেও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে গত এক দশকে কম বা শূন্য-চিনিযুক্ত পানীয়, কম্বুচা, প্রোটিন ড্রিংক, ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক এবং ফাংশনাল হাইড্রেশন পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সুস্থ বার্ধক্য, ক্রীড়া পুষ্টি এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ার ফলে প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, উদ্ভিজ্জ নির্যাস, কোলাজেন এবং প্ল্যান্ট-বেইজড উপাদানসমৃদ্ধ পানীয়ের উদ্ভাবন দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে কানাডাতেও এনহ্যান্সড ওয়াটার, প্রোটিন ড্রিংক, কম্বুচা, কোলাজেন পানীয় এবং অন্যান্য পুষ্টিকেন্দ্রিক ফাংশনাল বেভারেজের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। কোম্পানিগুলো এখন শুধু নতুন পণ্য উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করছে না; একই সঙ্গে তারা তাদের পণ্য সম্পর্কে একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল তথ্যভান্ডারও তৈরি করছে। পণ্যের বিস্তারিত উপাদান তালিকা, বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য, শিক্ষামূলক নিবন্ধ, বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার, খুচরা বিক্রেতাদের পণ্যের বিবরণ এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন— সবকিছুই এখন একটি ব্র্যান্ডের ডিজিটাল সম্পদে পরিণত হয়েছে। কারণ, এআই কোনো পণ্য সম্পর্কে যত বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়, সেই পণ্যকে সুপারিশ করার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ এবং কানাডার তুলনায় বাংলাদেশে ফাংশনাল বেভারেজের বাজার এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে ফলের রস, কার্বনেটেড কোমল পানীয় এবং বোতলজাত পানিই দেশের পানীয় বাজারের বড় অংশ দখল করে আছে। তবে দ্রুত পরিবর্তিত জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য সম্পর্কে বাড়তে থাকা সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে পরিচিতি নতুন ধরনের পুষ্টিকর ও কার্যকর পানীয়ের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। প্রোটিন, ভিটামিন, ইলেকট্রোলাইট, উদ্ভিজ্জ নির্যাস, প্রোবায়োটিক কিংবা কোলাজেনসমৃদ্ধ পানীয় এখনও বাংলাদেশে সীমিত পরিসরে রয়েছে। কিন্তু নগরায়ণ, মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা, ফিটনেস সংস্কৃতির বিস্তার এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা ভোক্তাদের খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে ভাবনার ধরন বদলে দিচ্ছে। ক্রমেই বেশি মানুষ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সুষম পুষ্টি এবং ব্যস্ত জীবনের সঙ্গে মানানসই স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও পানীয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
বাংলাদেশের খাদ্য ও পানীয় শিল্পের জন্য এটি একই সঙ্গে একটি বড় সুযোগ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এতদিন পর্যন্ত কোম্পানিগুলো মূলত পণ্যের স্বাদ, গুণগত মান, মূল্য, প্যাকেজিং, বিতরণ ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা করেছে। ভবিষ্যতেও এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। তবে এআই-নির্ভর যুগে এগুলো একাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। এখন কোম্পানিগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের পণ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য, বিস্তারিত এবং সুসংগঠিত তথ্য অনলাইনে সহজলভ্য রয়েছে। কারণ এআই এমন কোনো পণ্য সুপারিশ করতে পারে না, যেটি সম্পর্কে তার পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট ধারণা নেই। যদি কোনো পণ্যের উপাদান সম্পর্কে তথ্য অসম্পূর্ণ হয়, পণ্যের বিবরণ অস্পষ্ট হয় অথবা বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল কনটেন্টের অভাব থাকে, তাহলে এআই সেই পণ্যকে ভোক্তার জন্য উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হতে পারে।
ধরা যাক, বাংলাদেশের একটি কোম্পানি বাজারে একটি রেডি-টু-ড্রিংক কোলাজেন বেভারেজ নিয়ে এলো। শুধু এটিকে ‘কোলাজেন ড্রিংক’ হিসেবে প্রচার করলেই ভবিষ্যতের বাজারে সফল হওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ, ভোক্তারা হয়তো এআই-কে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘ত্বকের জন্য কোন পানীয় ভালো?’, ‘ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ কোলাজেন ড্রিংক কোনটি?’, ‘কম চিনি-যুক্ত বিউটি ড্রিংক কী?’ অথবা ‘বাংলাদেশে কোন কোলাজেন পানীয় পাওয়া যায়?’ এআই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবে কোম্পানির ওয়েবসাইট, অনলাইন স্টোর, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সংবাদ প্রতিবেদন, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র থেকে। যে কোম্পানি তার পণ্যের উপাদান, পুষ্টিগুণ, ব্যবহারকারীর ধরন এবং উপকারিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ করবে, সেই কোম্পানির পণ্য এআই-এর সুপারিশে স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকবে।
একই বিষয় অন্যান্য সব উদীয়মান পানীয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একটি প্রোটিন ড্রিংকের উচিত তার প্রোটিনের উৎস, পুষ্টিমান এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। একটি ইলেকট্রোলাইট পানীয় কখন এবং কীভাবে গ্রহণ করা উচিত, সেটিও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ভিটামিন-সমৃদ্ধ পানীয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভিটামিনের পরিমাণ এবং পুষ্টিগত অবদান স্বচ্ছভাবে জানানো উচিত। প্রোবায়োটিক, উদ্ভিজ্জ নির্যাস কিংবা কোলাজেনসমৃদ্ধ পানীয়ের ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্বশীল যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দেশ্য কখনোই অতিরঞ্জিত স্বাস্থ্য দাবি করা নয়; বরং ভোক্তা এবং এআই— উভয়ের কাছেই নির্ভুল, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
লেখক: খাদ্যবিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী