জুবাইর আল হাদী
“ভ্রমণ মানুষকে বদলে দেয়, নয়নকে দেয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, আর আত্মাকে দেয় নতুন গল্প বলার ভাষা।” এই কথাটি যেন টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্ণনা করতে গিয়ে বাস্তব হয়ে ওঠে। সুনামগঞ্জ জেলার সীমাহীন জলরাশি, বর্ষায় নীল আকাশের প্রতিবিম্ব আর হিজল-করচে ঘেরা বিস্তীর্ণ জলাভূমি যেন চোখে নয়, হৃদয়ে দেখা যায়। এখানে প্রকৃতি এতটাই নীরব, অথচ সমৃদ্ধ, যে প্রতিটি তরঙ্গ, প্রতিটি পাখির ডাকে শোনা যায় জীবনের এক গোপন কথোপকথন।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি এই টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি শুধুই একটি জলাভূমি নয়Ñএ যেন এক প্রাণবন্ত জৈববৈচিত্র্যের আশ্রয়। সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরের স্থানীয় নাম ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’। এই নামেই যেন তার প্রকৃত রূপের ইঙ্গিত লুকানো—অসংখ্য বিল, খাল ও প্রাণের এক ছন্দবদ্ধ উপকথা।
ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে প্রায় ৩৮টি ঝরণার জলধারা মিশে গেছে এই হাওরের শরীরে। ফলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানকার পানি স্বচ্ছ, ঠান্ডা ও জীবনঘনিষ্ঠ। বর্ষায় হাওর হয়ে ওঠে এক বিশাল জলরাশিÑযেখানে খাল, বিল আর জলজ বন একাকার হয়ে তৈরি করে এক স্বপ্নময় দৃশ্যপট। শীতে হাওর বদলে যায় এক অতিথিপাখির রাজ্যে, যেখানে সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের পার থেকে উড়ে আসে হাজারো পাখি।
২০১৯ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, এখানে ২০৮ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। এর মধ্যে আছে অনেক দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির পাখিও—যেমন কালোপাখা টেঙ্গি, লালবুক গুরগুরি, মাছমুরাল, পাতি লালপা ইত্যাদি। শুধু পাখিই নয়, টাঙ্গুয়ার হাওর হয়ে উঠেছে ছয় প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২০ প্রজাতির সাপ, চার প্রজাতির কচ্ছপ, নানা উভচর ও সরীসৃপ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়।
মাছের দিক থেকেও এই হাওর অনন্য। এখানে ১৪০টির বেশি স্বাদু পানির মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়। গাঙ মাগুর, বাইম, টেংরা, গুতুম, টাকি, গরিয়া, গুলশা প্রভৃতি মাছ এখানকার জেলেদের জীবিকার প্রধান ভিত্তি। এসব মাছ দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণবৈচিত্র্যের পাশাপাশি এর উদ্ভিদজগতও সমৃদ্ধ। হিজল, করচ, বরুণ, নলখাগড়া, পানিফল, শালুক, শাপলা, হেলেঞ্চা, বনতুলসী, চাল্লিয়া ইত্যাদি উদ্ভিদ হাওরের পরিবেশকে রাখে প্রাণবান। বিশেষ করে হিজল-করচের বন বর্ষায় পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়ালে যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা যেন রূপকথার জগত থেকে উঠে আসা।
২০০০ সালের ২৯ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার সাইট’ ঘোষণা করা হয়Ñএর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেই এই স্বীকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা, অতিরিক্ত পর্যটন আর বন নিধনের চাপে হাওরের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছেÑএমন আশঙ্কা গবেষক ও পরিবেশবিদদের।
তবু এখনও, বর্ষার মৌসুমে নৌকায় করে যখন কেউ হাওরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে, চারপাশে শুধু জল আর আকাশÑতখন জীবন যেন কিছুক্ষণের জন্য ধীর হয়ে আসে। হাওরের ঢেউ, পাখির ডানা আর দূরের পাহাড় থেকে নামা ঝরণার শব্দ তখন মানুষকে শুধু বিমুগ্ধই করে নাÑএকটি নতুন গল্প শোনায়, যেটি প্রকৃতি নিজেই বলে।