বিরল কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপের সংখ্যা বাংলাদেশে বাড়লো কীভাবে?

ছবির উৎস, Md Sahidul Islam

ছবির ক্যাপশান,

কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপ

    • Author,

      জান্নাতুল তানভী

    • Role,

      বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

  • Published

    ৩ ঘন্টা আগে
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর আগে প্রথমবারের মতো দেখা মেলে কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী নামের সাপটির, যেটিকে বিশ্বে বিরল বলে মনে করা হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে উত্তরাঞ্চলে এই সাপ যে পরিমাণে দেখা গেছে, সেই সংখ্যাকে বিস্ময়কর বলছেন কেউ কেউ।

কমলাবতী- নামটি আভিধানিক না হলেও গায়ের রঙের কারণেই স্থানীয়ভাবে ও গবেষকদের কাছে এই নামে পরিচিত সাপটি। লালচে কমলা রঙয়ের সাপটির মাথা অন্য সাপের চেয়ে বেশ আলাদা।

এই সাপের প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম ওলিগোডন খেরিনসিস (Oligodon Kheriensis)।

গবেষকরা জানান, এই প্রজাতির সাপ দৈর্ঘ্যে খুব বড় হয় না। প্রথম যেবার বাংলাদেশে এই সাপ পাওয়া যায়, তখন সেটি আড়াই ফুটের কাছাকাছি দৈর্ঘ্যের ছিল।

এবার প্রায় সাড়ে তিন ফুট দৈর্ঘ্যের কমলাবতী সাপ পাওয়া গেছে বলে জানান উদ্ধারকারীরা।

১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রথম আবিষ্কারের পরও সারা বিশ্বে এই সাপ দেখা যাওয়ার রেকর্ড খুব কম ছিল। ভারতের হিমালয় অঞ্চলের এই সাপটিকে শুধু উত্তর ভারত ও নেপালে দেখা যেত।

তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর দেখা পাওয়ার পর এটি তালিকাভুক্ত করা হয় বলে একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সারা পৃথিবীতে মাত্র ২২ থেকে ২৩ বার দেখা মেলার কথা গবেষকরা জানালেও সাপ উদ্ধারকারী বলছেন, এই সংখ্যা এখন বেশি।

বাংলাদেশে একুশ সালে যিনি এই সাপ উদ্ধার করেছেন তিনি হলেন মো. শহীদুল ইসলাম। ওই বছরের পর থেকে এখন পর্যন্ত শিশু ও পূর্ণবয়স্ক ৬৬টি সাপ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

একইসঙ্গে, একই জেলায় তিনি ছাড়াও আরো দুইজন এই প্রজাতির কয়েকটি সাপ পেয়েছেন, কিন্তু সেগুলোর তথ্য নথিভুক্ত নেই বলে উল্লেখ করেন মি. ইসলাম।

তিনি ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধীনে ভেনম রিসার্চ সেন্টার থেকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন তিনি।

মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "২১ সালে প্রথম পাওয়ার পর থেকে গত কয়েক বছরে ৬৬টা সাপ পায়েছি। এর মধ্যে ১২-১৩টা বাচ্চা, বাকিগুলা পূর্ণবয়স্ক। প্রথমে পঞ্চগড়ে পেলেও পরে ঠাকুরগাঁওয়ে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই পঞ্চগড়ে ছিল।"

তবে, কেন বাংলাদেশে এই সাপ আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে গবেষণার প্রয়োজন বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ভেনম রিসার্চ সেন্টারের ইনভেস্টিগেটর ও সুপারভাইজার অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

তবে সাপের অন্যান্য প্রজাতির ওপর গবেষণার তথ্য থেকে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে সাপের স্বাভাবিক গতিবিভি বাভাপ্রাপ্ত হলে এরা অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক স্থানে 'মাইগ্রেশন' করে বা নতুন বসতি গড়ে তোলে।

ছয়ই জুলাই সাড়ে তিন ফিটের কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপটি পাওয়া গেছে

ছবির উৎস, Md Sahidul Islam

ছবির ক্যাপশান,

ছয়ই জুলাই সাড়ে তিন ফিটের কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপটি পাওয়া গেছে

হিমালয় অঞ্চলের সাপ উত্তরবঙ্গে

সম্প্রতি পাঁচ ও ছয়ই জুলাই দুইটি কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপ পাওয়া গেছে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। সেখানকার চৌরঙ্গী বাজার নামে একটি গ্রামের ক্ষেতে মাছ ধরার জন্য দেওয়া রিং জালে এই সাপ ধরা পড়েছে বলে জানান ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সাপ উদ্ধারকারী শহীদুল ইসলাম।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত যতগুলো কোরাল রেড কুকরি সাপ পেয়েছেন তার মধ্যে ছয়ই জুলাই পাওয়া সাপটি সবচেয়ে বড়।

"এই সাপ তাদের কাছে অপরিচিত মনে হয়েছে। লাল সাপ তারা জীবনেও দেখেনি, বাঁচানোর জন্য আমাকে ফোন দিয়েছে," উদ্ধারের বিষয়ে বলেন মি. ইসলাম।

তিনি জানান, এরকম যতগুলো সাপ পাওয়া গেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পঞ্চগড়ের বোদা ও আটোয়ারি উপজেলা থেকে।

এর আগে বাঁশঝাড় বা বিভিন্ন ভবন খোঁড়ার সময় এই সাপটির দেখা মিললেও এবারই ফসলের ক্ষেতে, পানির কাছাকাছি দেখা গেল এটিকে।

মি. ইসলাম বলছেন, খাবারের সন্ধানে হয়তো সেখানে গিয়ে থাকতে পারে সাপটি।

এর আগে ২০২৩ সালের ২১শে জানুয়ারি পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলায় বাঁশঝাড়ের মাটি খনন করতে গিয়ে মা সাপসহ আটটি কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপের বাচ্চা পাওয়া যায়।

"কখনো ডিম পাইনি, চেষ্টা করছি কয়টা ডিম পাড়ে বোঝার জন্য। তবে একবার আটটি সদ্য প্রস্ফুটিত বাচ্চা পেয়েছিলাম, একটা মৃত ছিল। সেখান থেকে ধারণা করেছি, এই সাপ একসাথে ৮ থেকে ১০/১২টা ডিম পাড়ে," বলেন মি. ইসলাম।

কোরাল রেড কুকরির বৈশিষ্ট্য

২০২১ সালে প্রথম এই সাপ বাংলাদেশে উদ্ধারের পর আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'জার্নাল অফ এশিয়া-প্যাসিফিক বায়োডাইভারসিটি'তে 'ফার্স্ট রেকর্ড অফ দ্য কোরাল রেড কুকরি স্নেক ওলিগোডন খেরিনসিস ফ্রম বাংলাদেশ' শীর্ষক আর্টিকেল প্রকাশিত হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরীসহ তিনজন গবেষক এই আর্টিকেলটি লিখেছেন।

এই সাপটি নিয়ে এখন পর্যন্ত খুব কমই তথ্য পাওয়া যায় এবং এর বায়োলোজি নিয়ে গবেষণা নেই বলে উল্লেখ করেন ড. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

সাপটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, "এটা কমলা রংয়ের সাপ। নরম মাটির নিচে থাকে। খুবই লজ্জাবতী ধরনের। কমলাবতী নামটি এসেছে এর রং থেকে, গবেষকরাই দিয়েছেন।"

দৈর্ঘ্যে খুব এই বেশি বড় আকারের হয় না বলেও জানান তিনি।

"এই সাপটি গ্রুপে থাকে না, সে এককভাবে থাকতে খুব পছন্দ করে" এবং এই প্রজাতির সাপ মূলত 'নন-ভেনোমাস' বা বিষাক্ত নয় বলেও জানান এই গবেষক।

এর খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন, জীবনকাল সম্পর্কে তথ্য খুব কম। তবে সাপটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলেও তিনি মনে করেন। সাপটি এখনো ন্যূনতম উদ্বেগজনক, সংকটাপন্ন, অতি সংকটাপন্ন কোন তালিকায় পড়বে সেটি আইইউসিএনের তালিকাভুক্ত হয়নি।

প্রাণিজগতের বিভিন্ন প্রাণীকে নয়টি ক্যাটাগরিতে আইইউসিএন এই 'রেডলিস্ট' তৈরি করে।২০২৬ সালের এই রেডলিস্ট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

আইইউসিএনের তালিকাভুক্ত হওয়ার পরে এই কোরাল রেড কুকরি সাপটি কোন ক্যাটাগরিতে সেটি বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।

একটি ইটের দেয়ালের ওপর কোরাল রেড কুকরি সাপ

ছবির উৎস, Md Sahidul Islam

ছবির ক্যাপশান,

কোরাল রেড কুকরি সাপ

বাংলাদেশে কেন বেশি পরিমাণে দেখা যাচ্ছে এই সাপ?

বাংলাদেশে ৬৬টি কোরাল রেড কুকরি সাপ পাওয়ার তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন গবেষক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্ধারকারী শহীদুল ইসলাম প্রথম সাপটির হদিস পেলেও এর আগেও বাংলাদেশে এই সাপের খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু নথিভুক্ত না থাকায় দেশের সাপের তালিকায় সেটি আসেনি।

কিন্তু ২০২১ সালে পাওয়ার পর এটি দেশের ১০৩ তম সাপ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

কেন হিমালয় অঞ্চলের সাপটি উত্তরাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে এবং এর সংখ্যা বাড়ছে কেন- এমন প্রশ্নে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, অনুমান করে বলাটা কঠিন।

তবে, বাংলাদেশের ৩১টি সাপ নিয়ে করা তার আরেকটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন তিনি যেটি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সেই গবেষণায় তিনি দেখেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যাসহ নানা কারণ সাপকে তার গতিবিধিসহ অভ্যাস বদলাতেও বাধ্য করে।

"ওদের ওপরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট প্রভাব পেয়েছি, বন্যার প্রভাব পেয়েছি। প্রতি বছর বন্যা কিন্তু বাড়ছিল," বলেন অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

২০২১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৬ টি কমলাবতী সাপ পাওয়ার কথা জানান উদ্ধারকারী শহীদুল ইসলাম

ছবির উৎস, Md Sahidul Islam

ছবির ক্যাপশান,

২০২১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৬ টি কমলাবতী সাপ পাওয়ার কথা জানান উদ্ধারকারী শহীদুল ইসলাম

মানুষের কারণে সাপের আবাসস্থল, অভ্যাসগত ও আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে বলেও উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন প্রেক্ষাপটে সাপ তার পছন্দসই স্থানে 'মাইগ্রেশন' করে।

"যেখানে বন থাকার কথা সেখানে বিল্ডিং তুলে ফেলতেছি। এই ধরনের বিষয়গুলোর কারণে বেশিরভাগ প্রাণীর স্থানান্তর দেখা যায়। এটা হচ্ছে নরমাল মাইগ্রেশন বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়," বলেন এই গবেষক।

তিনি জানান, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলা পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও হিমালয়ের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এই সাপটি এখানে সহজে চলাচল করতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলছিলেন, বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গেই মূলত সাপটির দেখা যাওয়ার কারণ ওই এলাকা উঁচু ভূমি।

"আমাদের ওই অঞ্চলগুলো থেকে হিমালয় থেকে বেশি দূরে নয়, মনে করেন একশ বা দুইশো কিলোমিটার। পরের অংশগুলো জলাভূমি, নিচু বেসিন। তাই উঁচু ভূমিতেই তাদের পাওয়া যায়।"

অধ্যাপক চৌধুরীর লেখা আর্টিকেলে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের উত্তর প্রদেশের উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আসামের কোঁকরাঝাড়, ভারতের মেঘালয়ের পশ্চিম গারো পাহাড়, নেপালের হিমালয় অঞ্চল, দক্ষিণ-মধ্য নেপালের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক, পশ্চিমের শুক্লাফান্তা ন্যাশনাল পার্ক এবং বারদিয়া ন্যাশনাল পার্ক দক্ষিণ-পূর্ব নেপালের ঝাঁপাও এবং বাংলাদেশের জেলা পঞ্চগড়ে এই সাপটির দেখা মিলেছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews