আর্লিং হালান্ডের দল নরওয়ে ফুটবলের 'সোনালি প্রজন্ম' গড়ে তুললো কীভাবে?

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলতে যাচ্ছে নরওয়ে যা তাদের পুরো জাতিকে ফুটবল উন্মাদনায় যুক্ত করেছে

    • Author,

      সিয়ারান ভারলি

    • Role,

      বিবিসি স্পোর্ট জার্নালিস্ট

  • Published

    ৪০ মিনিট আগে
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়ে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে হুট করেই যেন এক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, আর এর কারণ শুধু আর্লিং হালান্ড নন।

ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার, যিনি টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে সাতটি গোল করেছেন, মার্টিন ওডেগার্ডের সঙ্গে দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখ। ওডেগার্ড একই সঙ্গে আর্সেনাল ও জাতীয় দলের অধিনায়ক।

তবে নরওয়ের যুব উন্নয়ন ব্যবস্থার সফলতা ফুটে উঠছে, এমন মুখ কেবল তারাই নন। বিশ্বকাপের জন্য ঘোষিত ২৬ সদস্যের দলে ১৭ জন খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষ চার লিগে খেলেন - প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেসলিগা, লা লিগা ও সিরি আ।

তাদের বেশিরভাগই নরওয়ের জাতীয় যুব ফুটবল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ন্যাশনাল টিম স্কুল (এনটিএস)-এর তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন। এই কাঠামোটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের পর ২৮ বছর বিশ্বকাপের বাইরে ছিল নরওয়ে। কিন্তু ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ আসরে ফিরেই নরওয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে চলে গেছে এবং ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে শনিবার। এর আগে তারা নকআউট পর্বে আইভরি কোস্ট ও ব্রাজিলকে হারিয়েছে।

নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের খেলোয়াড় উন্নয়ন বিভাগের প্রধান হাকন গ্রটল্যান্ড বলেন, এখন যা দেখা যাচ্ছে তা হলো দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে করা পরিকল্পনার ফল, যার লক্ষ্য ছিল শীতকালীন ক্রীড়ার জন্য পরিচিত নরওয়েকে একটি ফুটবল জাতিতে রূপান্তর করা।

তিনি বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "২০১০ সালে যখন আমি ফুটবল ফেডারেশনে কাজ শুরু করি, তখন আমার স্বপ্ন ছিল নরওয়ে যেন বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। কারণ আমরা অনেক বছর ধরে শুধু ১৯৯৮ সালের কথা বলে যাচ্ছিলাম।"

গ্রটল্যান্ড নরওয়ের সাফল্যের পেছনে দুটি প্রধান কারণের কথা বলেন - ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে কৃত্রিম মাঠে বিনিয়োগ এবং এনটিএস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হওয়া কোচিং বিপ্লব।

আর্লিং হালান্ড

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সাতটি গোল করেছেন আর্লিং হালান্ড

জুয়ার আয়ের টাকায় ক্রীড়া অবকাঠামো

২০০০ সালের পর থেকে নরওয়ে বিপুল সংখ্যক কৃত্রিম মাঠ নির্মাণ করেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫৩৯টি নতুন মাঠ নির্মিত হয়েছে এবং আরও ৫৮৬টি সংস্কার করা হয়েছে।

কঠোর শীতের দেশ হিসেবে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক।

গ্রটল্যান্ড বলেন, "নরওয়েতে ফুটবল গ্রীষ্মকালীন খেলা থেকে সারা বছরের খেলায় পরিণত হয়েছে। আমার সময়ে শীতকালে আমাদের খুবই খারাপ মাঠে খেলতে হতো, বরফের ওপর এবং এ ধরনের (প্রতিকূল) পরিবেশে।"

১৯৯০-এর দশকে নরওয়ের পরিচয় ছিল পরিশ্রমনির্ভর রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য। পূর্বানুমানযোগ্য মাঠে খেলার সুযোগ তাদের ফুটবলকে আরও কারিগরি ঘরানার করে তুলেছে, যার প্রতীক ২৭ বছর বয়সী অধিনায়ক ওডেগার্ড।

গ্রটল্যান্ড যোগ করেন, "এটা আংশিকভাবে কৃত্রিম মাঠের কারণে, তবে প্রভাবের বিষয়ও রয়েছে। সবাই একটু ভিন্ন কিছু চাইছিল। কিন্তু এখন বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছে, কারণ আমরা যথেষ্ট ডিফেন্ডার তৈরি করতে পারছি না।"

রাশিয়ার পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় তেল মজুদের কারণে নরওয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ।

তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া খাতে অর্থায়নের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো জুয়ার আয়ের ব্যবহার।

দেশটিতে বাজি ধরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নরস্ক টিপিং তাদের আয়ের ৬৪ শতাংশ ক্রীড়া খাতে দান করে। এই অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে।

২০২৬ সালে নরস্ক টিপিং ক্রীড়া অবকাঠামোর জন্য ২০০ কোটিরও বেশি নরওয়েজিয়ান ক্রোনার (১৫ কোটি ২৭ লাখ পাউন্ড) আয় করেছে।

খেলার অনুশিলনে নরওয়ে দলের ফুটবলাররা, তাদের পরনে আকাশি জার্সি ও নীল হাফপ্যান্ট

ছবির উৎস, Chris Arjoon/Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

শীতপ্রধান দেশ নরওয়েতে কৃত্রিম মাঠের কারণে ফুটবল এখন সারা বছরের খেলায় পরিণত হয়েছে; ছবিতে অনুশীলনে ব্যস্ত হালান্ড ও ওডেগার্ড

'শৈশবে ওডেগার্ডের মতো কাউকে আমি কখনও দেখিনি'

কৃত্রিম মাঠ উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রটল্যান্ড ২০১০ থেকে ২০২০ সময়কালকে একটি 'বিপ্লব' হিসেবে উল্লেখ করেন, "যেখানে নরওয়েজিয়ান ফুটবল, শীর্ষ ক্লাবগুলো, ফেডারেশন এবং জেলা পর্যায়ের সংস্থাগুলো খেলোয়াড় উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে"।

ইউরো ২০১২-এ জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ২০১৩ সালে ল্যান্ডসলাগস্কোলেন প্রতিষ্ঠা করে, যা এনটিএস নামে পরিচিত।

ব্রাজিলের বিপক্ষে নরওয়ের ২-১ ব্যবধানে জয়ে মাঠে নামা ১৫ জনের মধ্যে ১৪ জন আগে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাদের মধ্যে ১১ জন অনূর্ধ্ব-১৫ বা অনূর্ধ্ব-১৬ বয়স থেকে এনটিএস কাঠামোর অংশ ছিলেন।

গ্রটল্যান্ড ব্যাখ্যা করেন, এনটিএস কোনো একাডেমি বা ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্লেয়ারফন্টেইনের মতো কেন্দ্রীয় স্কুল নয়; বরং এটি "একটি জাতীয় উন্নয়ন কাঠামো, যা তৃণমূল ক্লাব, জেলা, শীর্ষ ক্লাব এবং ফেডারেশনকে যুক্ত করে"।

তিনি যোগ করেন, "অন্যান্য দেশের মতো নয়, যেখানে শীর্ষ ক্লাবগুলো প্রতিভা বিকাশ নিয়ে কাজ করে, আর তৃণমূল ক্লাবগুলো শুধু আনন্দের জন্য খেলে।

"নরওয়েতে সবাই একসঙ্গে কাজ করে।"

বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দল যখন নিজেদের প্রথম ক্লাবের জার্সি পরে দলীয় ছবি তোলে, তখন তারা এই তৃণমূল ব্যবস্থার গুরুত্বও স্বীকার করে।

ইংল্যান্ডে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় আট বছর বয়সেই প্রিমিয়ার লিগের একাডেমিতে চলে যায়, কিন্তু নরওয়েতে শিশুরা ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের তৃণমূল ক্লাবেই থাকে।

গ্রটল্যান্ড বলেন, "আমাদের দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমরা খুব তাড়াতাড়ি কোনো দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করি না।"

তিনি ২৫ বছর বয়সী হালান্ডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, "১৪ বছর বয়স থেকে তিনি ন্যাশনাল টিম স্কুল (এনটিএস) কাঠামোর জাতীয় প্রতিভা ক্যাম্পের অংশ ছিলেন। কিন্তু তখন কেউ ভাবেনি যে তিনি সেই বয়সভিত্তিক দলের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন।"

অল্প বয়স থেকেই যাকে নিয়ে গ্রটল্যান্ড নিশ্চিত ছিলেন, তিনি হলেন ওডেগার্ড। তিনি স্বীকার করেন, ১১ বছর বয়সে ওডেগার্ডকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকেই এনটিএস-এর পুরো দর্শন অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই মিডফিল্ড প্রতিভা ১৬ বছর বয়সে ৪০ লাখ ইউরো (৩৪ লাখ পাউন্ড) চুক্তিতে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন।

গ্রটল্যান্ড যোগ করেন, "নরওয়েতে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বলতে আমরা বুঝি সেই খেলোয়াড়কে, যে খেলাটিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, যে নিজের উন্নয়নের দায়িত্ব নেয় এবং দলের উন্নয়নের দায়িত্বও নেয়।"

"আমরা বল নিয়ন্ত্রণ, গতি বা এ ধরনের বিষয় মাপি না। আমরা শুরু করি এই প্রশ্ন দিয়ে–এই খেলোয়াড় কি খেলাটিকে ভালোবাসে?"

"ওডেগার্ড থেকেই এই অনুপ্রেরণা এসেছে - শৈশবে তার মতো কাউকে আমি কখনও দেখিনি।"

বিশ্বকাপ মাঠের গ্যালারিতে নরওয়ের সমর্থদের নৌকার দাঁড় টানার ভঙ্গি যেই ভঙ্গিটি একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে

ছবির উৎস, VCG via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

বিশ্বকাপ মাঠের গ্যালারি আর নরওয়ের সীমানা ছড়িয়ে সামাজিক মাধ্যমেও ঢেউ তুলেছে হালান্ডদের দুর্দান্ত এগিয়ে চলা

কোনো খেলোয়াড়ই দলের চেয়ে বড় নয়

গ্রটল্যান্ডের মতে, এনটিএস যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় তা হলো "নিরাপত্তা, আস্থা ও ঐক্য"।

তিনি বলেন, "বিশ্বকাপে আমরা এখন এর ফলই দেখছি। কোনো একক খেলোয়াড়ই দলের চেয়ে বড় নয়।"

তার কাছে নরওয়ের চেতনার প্রতীক হলো ভাইকিংদের নৌকা বাইচের ভঙ্গিমা, যা এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে টাইমস স্কয়ার ও বিভিন্ন স্টেডিয়ামে জনপ্রিয় হয়েছে - একটি জাতি একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে।

তিনি যোগ করেন, "এই নৌকা বাইচের ভঙ্গিমা, এটি আসলে ঐক্যের বিষয়।"

তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এনটিএস কি নরওয়ের ঘরোয়া লিগকেও সমৃদ্ধ করতে পারবে?

কোচ স্টালে সোলবাক্কেনের দলে মাত্র চারজন খেলোয়াড় দেশীয় লিগে খেলেন, যাদের মধ্যে তিনজন বোদো/গ্লিম্টের প্রতিনিধিত্ব করেন। গত মৌসুমে ক্লাবটির রূপকথার মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগে শেষ ষোলোয় ওঠা হয়তো আরও ভালো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গ্রটল্যান্ড বলেন, "নরওয়েজিয়ান ফুটবলে আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো খেলোয়াড় তৈরি করা এবং তাদের বড় লিগগুলোতে বিক্রি করা। একই সময়ে, গত কয়েক বছরে আমাদের নিজস্ব লিগও উন্নতি করেছে। দুটি বিষয়ই একে অপরকে সহায়তা করে।"

নরওয়ের কোচ সোলবাক্কেন বিবিসি স্পোর্টকে বলেন, "আমাদের এমন খেলোয়াড় আছে যাদের বয়স প্রায় ৩০ বা তার বেশি। এমন খেলোয়াড় আছে যাদের বয়স ১৮ থেকে ২০-এর মধ্যে। আর মাঝামাঝি বয়সের এমন খেলোয়াড়ও আছে যারা এখন নিজেদের সেরা সময়ে রয়েছে।"

"আমি জানি না এটিকে একটি প্রজন্ম বলা যায় কি না, তবে এটি ক্লাবগুলোর কঠোর পরিশ্রম এবং ফেডারেশনের কঠোর পরিশ্রমের ফল।"



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews