গত বছরের শুরুতে সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী এআই মডেল নিয়ে এসে বাজার কাঁপিয়ে দিয়েছিল চীনা প্রতিষ্ঠান ‘ডিপসিক’।
তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে গ্রাহকদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল—হয় কম খরচের কিন্তু কিছুটা কম ক্ষমতাসম্পন্ন চীনা এআই, অথবা শত কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত ওপেনএআই বা অ্যানথ্রোপিক-এর মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন এআই মডেল।
তবে বেইজিংভিত্তিক স্টার্টআপ ‘জেড.এআই’ গত মাসে বাজারে এনেছে তাদের নতুন মডেল ‘জিএলএম-৫.২’। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মডেলটির হাত ধরেই এবার মার্কিন ও চীনা এআই-এর মধ্যকার ব্যবধান ঘুচে যেতে চলেছে।
অত্যন্ত জটিল কোডিং এবং ‘এজেন্টিক’ কার্যক্ষমতার (খুব সামান্য প্রম্পট বা নির্দেশনায় জটিল কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতা) কারণে সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ‘জিএলএম-৫.২’।
মার্কিন মডেলগুলোর তুলনায় মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ খরচে প্রায় সমমানের সেবা দেওয়ায় অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে একটি ‘মিনি ডিপসিক মোমেন্ট’ বা ছোটখাটো ডিপসিক বিপ্লব বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
ইতোমধ্যেই ‘ওপেনরাউটার’-এর মতো থার্ড-পার্টি ডেভেলপার প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহারের তালিকায় দ্রুত ওপরের দিকে উঠে এসেছে এই মডেলটি, যেখানে এটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের মডেলগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। ক্লাউড ডেটা প্ল্যাটফর্ম ‘স্নোফ্লেক’-এর সিইও শ্রীধর রামাস্বামী থেকে শুরু করে প্রখ্যাত ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট মার্ক অ্যান্ড্রেসেন পর্যন্ত অনেকেই এর ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন কক্ষপথ হারানো টেলিস্কোপ উদ্ধারে রোবট পাঠাল নাসা
-6a484131d1d67.jpg)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক এআই উপদেষ্টা ডেভিড স্যাক্স ‘অল-ইন’ পডকাস্টে বলেন, ‘আমরা অবশেষে এমন একটি চীনা ওপেন-ওয়েট মডেল পেয়েছি যা ওপেনএআই বা অ্যানথ্রোপিকের বর্তমান মডেলগুলোর মতোই দুর্দান্ত। এটি অ্যানথ্রোপিকের ‘ওপাস ৪.৮’ থেকে সামান্য নিচে হলেও ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি ৫.৫’-এর সমকক্ষ।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো নিয়ম নীতি আনা উচিত নয় যা মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর গতি ধীর করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রোপিকের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ওপেনএআই-এর সর্বশেষ ‘জিপিটি-৫.৬’ মডেলের বাজারে আসতে বিলম্ব হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে এই চীনা মডেলের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে।
বেইজিংভিত্তিক কনসালটেন্সি ফার্ম ‘কনকর্ডিয়া এআই’-এর সিইও ব্রায়ান সে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ডেভেলপার কমিউনিটি এখন বুঝতে পারছে যে, শুধুমাত্র মার্কিন মালিকানাধীন এআই মডেলের ওপর নির্ভর করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।’
পাশাপাশি, বাণিজ্যিক খাতে এআই ব্যবহারের খরচ দিন দিন বাড়ছে। বন্ধ-উৎস বা ক্লোজড-সোর্স মডেলগুলো ব্যবহারের সময় প্রচুর ‘টোকেন’ (এআই ব্যবহারের পরিমাপক ইউনিট) খরচ হয়, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ‘জিএলএম-৫.২’-এর মতো সাশ্রয়ী এবং ওপেন-সোর্স মডেলের দিকে ঝুঁকছেন ডেভেলপাররা।
‘হাগিং ফেস’-এর সাবেক কর্মকর্তা তিয়েঝেন ওয়াং জানান, এই মডেলটি কোনো জটিল ফাইন-টিউনিং ছাড়াই সরাসরি ব্যবহার উপযোগী হওয়ায় ডেভেলপারদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে।
মার্কিন বাজারে মূল বাধা: ডেটা নিরাপত্তা
প্রযুক্তিগতভাবে দারুণ হলেও পশ্চিমা বিশেষ করে মার্কিন কর্পোরেট খাতে এর বড় আকারের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো ‘ডেটা নিরাপত্তা’ ও ভূ-রাজনীতি। ব্যাংকিং বা সাইবার নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ও নিয়ন্ত্রিত খাতগুলো চীনা মডেল ব্যবহারে বেশ সতর্ক।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের প্রধান এআই অ্যানালিস্ট ওয়েই সান জানান, ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ক্লায়েন্ট বা অংশীদার তাদের এআই সিস্টেমে চীনা মডেল অন্তর্ভুক্ত করতে একেবারেই রাজি নন।
তবে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরগতিতে এগোলেও, ছোট ও মাঝারি স্টার্টআপগুলো এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চীনা মডেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ‘হ্যালো চায়না টেক’ নিউজনলেটারের প্রতিষ্ঠাতা পো ঝাও বলেন, ‘ডেভেলপারদের কাছে মডেলটি কোথা থেকে এসেছে তার চেয়ে বড় বিষয় হলো—এটি ঠিকঠাক কাজ করছে কিনা এবং এর খরচ কেমন। তাই এটি রাতারাতি মার্কিন মডেলগুলোর বিকল্প হয়ে না উঠলেও, নির্দিষ্ট ডেভলপারদের মাঝে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।’