দীর্ঘ সময় অফিসে থাকা, চাকরি হারানোর ভয়, অযৌক্তিক টার্গেট - এগুলো কি কেবল মানসিক অস্বস্তি? নাকি শরীরেও এর গভীর প্রভাব পড়ে? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘস্থায়ী কর্মক্ষেত্রের চাপ শরীরে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির সঙ্গে মিলে যায়।
শরীর স্বাভাবিকভাবে সাময়িক হুমকি সামলাতে যে অবস্থায় যায়, তাকে বলা হয় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যদি প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা, অতি দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বা অবিচারের অনুভূতি কাজ করে, তাহলে এই সতর্ক অবস্থা আর বন্ধ হয় না।
ফলে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে, অর্থাৎ হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বারবার বেড়ে যায়। এতে রক্তনালির ভেতরের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা আগাম মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত। একইভাবে, কর্মক্ষেত্রে অন্যায্যতা বা অতি চাহিদা থাকলে অসুস্থতার ঝুঁকি ৩৫-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকির সঙ্গে তুলনীয়।
দীর্ঘস্থায়ী চাপ শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এগুলো সহায়ক হলেও, দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রায় থাকলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
একদিকে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে শরীরে লো-গ্রেড ইনফ্ল্যামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয় - যা ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হৃদ্রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শুধু কাজের পরিমাণ নয় - অন্যায্য আচরণ, অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত বা অপমানজনক পরিবেশও ক্ষতিকর। গবেষকেরা বলছেন, টক্সিক ম্যানেজমেন্ট কর্মীদের জন্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়।
কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু স্বাস্থ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।
>> নির্দিষ্ট সময়ের পর কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া
>> সাপ্তাহিক ছুটি পুরোপুরি ব্যবহার করা
>> অন্যায্য চাপ নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা
>> কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
>> প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং নেওয়া
তব এখানে বড় দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের। কর্মীদের মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কাজের সময় ও প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত রাখা এবং সহায়ক সংস্কৃতি গড়ে তোলা – এই কাজগুলো সাধারণত ব্যক্তি করে উঠতে পারেন না, তাই প্রতিষ্ঠানকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
পরোক্ষ ধূমপান যেমন নীরবে ক্ষতি করে, তেমনি অফিসের দীর্ঘস্থায়ী চাপও ধীরে ধীরে শরীর ও মনকে ক্ষয় করতে পারে। তাই সাফল্যের দৌড়ে নিজের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস করবেন না। কাজ থাকবে, কিন্তু সুস্থ শরীর ও শান্ত মন ছাড়া কোনো সাফল্যই টেকসই নয়।
সূত্র: হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
এএমপি/জেআইএম