দেশ এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং অব্যবস্থাপনার ফলে সবুজ আচ্ছাদন কমছে; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘন ঘন বন্যা ও খরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল লক্ষ্য কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে? শুধু কর্মসূচি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এটিকে একটি সর্বজনীন সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া।
বৃক্ষ কেবল পরিবেশের অলংকার নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ যেমন অক্সিজেন সরবরাহ করে, তেমনি কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি গাছ মাটির উর্বরতা রক্ষা করে, বন্যা ও ভূমিক্ষয় কমায় এবং জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। তাই বৃক্ষরোপণকে আলাদা কোনো কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়নকৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
এই জায়গায় কিছু সামাজিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে তারা যে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক কার্যক্রম গড়ে তুলছে, তা দেখাচ্ছে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের অনেক কর্মসূচিই টেকসই হয় না। গাছ লাগানো হয়, কিন্তু তার রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে কয়েক মাস বা বছরের মধ্যেই সেই উদ্যোগের সুফল হারিয়ে যায়। তাই এখন সময় শুধু ‘গাছ লাগানো’ নয়, বরং ‘গাছ বাঁচানো’-কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে বৃক্ষরোপণকে যুক্ত করা। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বছরে নির্দিষ্টসংখ্যক গাছ লাগানো ও তার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।
দ্বিতীয়ত ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা। ধর্মীয় মূল্যবোধ কাজে লাগিয়ে বৃক্ষরোপণকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে এটি দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
তৃতীয়ত স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
চতুর্থত গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে আরও সক্রিয় করা। সফল উদ্যোগগুলো তুলে ধরা এবং ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করা হলে মানুষ বাস্তব শিক্ষা পাবে এবং অংশগ্রহণে উৎসাহিত হবে।
সবশেষে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের বিকল্প নেই। একজন মানুষ যদি তার জীবনে অন্তত ২০টি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করে, তাহলে ১৮ কোটির দেশে এর প্রভাব কতটা বিশাল হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এই ছোট ছোট অঙ্গীকারগুলোই একসময় জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বৃক্ষরোপণ এখন আর কোনো বিকল্প নয়; এটি একটি অপরিহার্য জাতীয় অগ্রাধিকার। সরকারের পরিকল্পনা, সামাজিক উদ্যোগ এবং নাগরিক অংশগ্রহণ-এই তিনের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ২৫ কোটি গাছ শুধু একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে একটি সবুজবিপ্লবের সূচনা।
শেষ কথা একটাই-
আজকের একটি গাছই আগামী দিনের একটি জীবন। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা কি একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়তে প্রস্তুত?
♦ লেখক : পরিবেশকর্মী