বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ার প্রভাব পড়েছে দেশের রফতানি খাতে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা আট মাস রফতানি আয় নিম্নমুখী রয়েছে। মূলত তৈরি পোশাক শিল্প কাক্সিক্ষত রফতানি আয় অর্জন করতে না পারায় সামগ্রিকভাবে এ খাত চাপে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সঙ্ঘাত। এ সঙ্ঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সঙ্কট ইতোমধ্যে পোশাকশিল্পে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে শিল্পটি আরও গভীর সঙ্কটে পড়তে পারে।
তাদের মতে, যুদ্ধের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। ইতোমধ্যে অনেক শিল্পমালিক অভিযোগ করছেন, কারখানা সচল রাখতে চাহিদামতো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপাকে ফেলছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, কয়েক মাস ধরেই রফতানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে, যা অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে নানা পরিবর্তনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দেশে ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকারের নীতিগত সহায়তা ও জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যায়, যা ক্রয়াদেশ হ্রাসের ঝুঁঁকি তৈরি করে। তিনি জানান, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে পোশাকশিল্প বড় ধরনের ঝুঁঁকির মধ্যে পড়তে পারে। এ জন্য ইতোমধ্যে কারখানাগুলোর ডিজেল চাহিদার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা সরকারের সাথে আলোচনায় উপস্থাপন করা হবে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো: ফজলে শামীম এহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এ অবস্থায় অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেয়া জরুরি। অন্যথায় দেশের প্রধান রফতানিমুখী শিল্প তৈরি পোশাকখাত মারাত্মক ঝুঁঁকিতে পড়তে পারে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান সঙ্কট মোকাবেলায় পোশাকখাতে টেকসই জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি সরকারের বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। সহায়ক নীতি থাকলে উৎপাদকদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসের মধ্যে আট মাসেই তৈরি পোশাকশিল্পে রফতানি আয় কমেছে। মার্চ মাসে এ খাতে রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ওই মাসে নিট পোশাক থেকে আয় হয়েছে ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ২০ শতাংশ কম। অন্য দিকে ওভেন পোশাক থেকে রফতানি আয় ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রফতানি আয় হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।