ঢাকার ফুটবল ইতিহাসে এক অনুচ্চারিত অধ্যায়ের নাম মঞ্জু। এই নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে গ্যালারির গর্জন, ঘামের গন্ধ ও সাদা-কালো জার্সির অগণিত স্মৃতি। একসময় দেশের ফুটবলাঙ্গনে ‘নান্নু-মঞ্জু’ দুই ভাই ছিলেন যেন একই আকাশের দুই তারা। একদিকে আবাহনীর নান্নু, অন্যদিকে মোহামেডানের মঞ্জু। একই রক্ত, অথচ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দুর্গে দাঁড়িয়ে তারা লিখেছিলেন ঢাকার ফুটবলের সবচেয়ে আবেগময় প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প। মাঠে নামলেই মঞ্জুকে আলাদাভাবে চিনতেন সমর্থকরা। বল পায়ে তার দৌড় ছিল যেন বজ পাতের মতো দ্রুত। দর্শক জানত এই মানুষটি শুধু খেলেন না, তিনি ম্যাচের গল্প বদলে দেন। কখনো ডান প্রান্তে ঝড় তোলতেন, কখনো হঠাৎ ভেতরে ঢুকে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিতেন নিঃশব্দ আঘাতে। ঢাকার ফুটবলের সেই সোনালি সময়ে তিনি ছিলেন মোহামেডানের এক নির্ভরতার নাম। সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। মাঠ বদলায়, জীবন বদলায়। আজ মঞ্জু পরিবারসহ বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রবাসী জীবনের বাস্তবতা তাকে ঘিরে ধরলেও ফুটবল তার ভেতরে এখনো নিভে যায়নি। তা পরিণত হয়েছে স্মৃতির এক উজ্জ্বল আগুনে। বিশ্বকাপ এলেই আবার জ্বলে ওঠে। বিশ্বকাপ ঘিরে মঞ্জুর ভেতরে জমেছে এক নিঃশব্দ উচ্ছ্বাস। এবার স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার পরিকল্পনা না থাকলেও টেলিভিশনের সামনে পরিবার নিয়ে বসে পড়বেন মঞ্জু। যেন প্রতিটি ম্যাচই একেকটি পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। বিশ্বকাপে তার ব্যক্তিগত টান রয়েছে জার্মানির প্রতি। তাদের শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা তাকে সব সময় আকর্ষণ করেছে। আবার আফ্রিকার দেশগুলোর খেলায় তিনি খুঁজে পান এক ভিন্ন আগুন। অদম্য লড়াই, অনিশ্চয়তার মধ্যে উঠে দাঁড়ানোর সাহস। এ দুই বিপরীত আবেগই তার ফুটবল দৃষ্টিকে করেছে সমৃদ্ধ, গভীর। পরিবারের ভেতর ফুটবল নিয়ে আবেগ একরকম নয়। দুই ছেলে বড় হয়েছে ভিন্ন সংস্কৃতির ছায়ায়, যেখানে স্থানীয় খেলাই বেশি পরিচিত। তবে নাতিদের চোখে লিওনেল মেসি এখনো এক বিস্ময়ের নাম, যা তাদের কাছে শুধু খেলোয়াড় নয়, এক অলৌকিক গল্পের প্রতিচ্ছবি। স্ত্রী আবার ফুটবলের খুব বড় অনুরাগী নন, ফলে বিশ্বকাপের রাতগুলোতে মঞ্জুর সঙ্গী হয় নিঃশব্দ ঘর, জ্বলজ্বলে পর্দা আর স্মৃতির ঢেউ। তবু এই নিঃসঙ্গতা তাকে একা করে না। বরং নিয়ে যায় আরও গভীরে, ঢাকার সেই মাঠে, যেখানে একসময় তার পায়ের ছোঁয়ায় গ্যালারি কেঁপে উঠত, পতাকা উড়ত, আর দর্শকের হৃদয় একসঙ্গে স্পন্দিত হতো। নান্নু আজ নেই; কিন্তু তার স্মৃতি মঞ্জুর ভেতরে এখনো জীবন্ত। বিশ্বকাপের আলো-আঁধারিতে সেই ভাইয়ের কথা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোন দলকে তিনি ভালোবাসতেন, তা হয়তো সময় মুছে দিয়েছে; কিন্তু মঞ্জুর বিশ্বাস, নান্নু শেষ পর্যন্ত ফুটবলকেই ভালোবাসতেন, তার সৌন্দর্যকেই। মঞ্জু মাঠে না থাকলেও ফুটবল তাকে ছাড়েনি। সময় তাকে সরিয়ে দিয়েছে দর্শকের আসনে; কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে তিনি এখনো সেই একই খেলোয়াড়। মঞ্জুর প্রতিটি স্মৃতি ঢাকার ফুটবলের ইতিহাসে লেখা আছে এক নীরব কিন্তু গভীর সুরে।