স্বাস্থ্য শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না। অথচ, বাংলাদেশে এখনও স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়নি। শহর-গ্রামের বৈষম্য, জনবল সংকট, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং সেবার মানগত ঘাটতি দূর করে একটি সমন্বিত ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তাই, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:
১. ইর্মাজেন্সি মেডিসিন বিভাগ খোলা এবং কোর্স চালু করা। সারাদেশের সকল ‘ইর্মাজেন্সি বিভাগ’ অন্যান্য বিভাগের মতো চালু করা। অর্থাৎ মেডিকেল অফিসার, কনসালটেন্ট, সহকারী প্রফেসরসহ সকল পদ যারা এই বিষয়ে অভিজ্ঞ, তারা উক্ত বিভাগে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করবে, যা ইর্মাজেন্সি মেডিসিন বিভাগের অধীনস্ত থাকবে। ইর্মাজেন্সিতে ইর্মাজেন্সি মেডিসিনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যারা সারাদেশের ইর্মাজেন্সি মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকই হবেন এবং নিজেদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং সোসাইটি তৈরি করে ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদান করবেন। বর্তমানে প্রতিটি উপজেলায় মাত্র ২ জন ইর্মাজেন্সি মেডিকেল অফিসার পদ আছে, যা বাড়ানো প্রয়োজন এবং এই বিভাগে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়া সময়ের দাবি। বিসিএস ক্যাডারদের পরপরই পদায়ন না করে ট্রেনিং ও ফাউন্ডেশন কোর্স শেষ করে পদায়ন করা উচিত।
২. মেডিকেল এডুকেশনে গবেষণা যুক্ত করা এবং মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় বাড়ানো। যারা গবেষণা করবে তাদের বেতন কাঠামোসহ অন্যান্য বিষয় স্বতন্ত্র থাকতে হবে। চিকিৎসকদের উচ্চ শিক্ষা সহজ করা এবং সংখ্যা বাড়ানো দরকার। উচ্চ শিক্ষাকালীন সময়ে সরকারি ঋণ সহায়তা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. প্রতিটি জেলায় ‘চিকিৎসা তথ্য কেন্দ্র’ খোলা যেখানে সরকারি বেসরকারি সকল সুবিধা ও তথ্য যেন রোগীরা নিজে খোঁজ নিতে পারে। ওয়েবসাইট ব্যবহার করলে ভালো হয়।
৪. হাসপাতালের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা একটি ‘নির্দিষ্ট কালারের’ আলাদা ভবনে করা উচিত। মানসম্মত রিপোর্টের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে।
৫. রোগীর চাপ কমানোর জন্য জেলা হাসপাতালগুলোতে নিজস্ব জনবল দিয়ে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করে ‘রেফারাল’ সিস্টেম চালু করতে হবে।
৬. অটোমেশন চালু করা উচিত। স্বল্প পরিসরে হলেও হেলথ ইন্সুরেন্স চালু করা।
৭. অনলাইন ব্লাড ব্যাংক সক্রিয় করা।
৮. বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের মান ও তাদের তালিকা নিজ জেলায় জনসমক্ষে প্রদর্শন করে ক্রম করে প্রকাশ করা এবং প্রতি তিন মাস পরপর এই তালিকা হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক অটো করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাম কমাতে হবে। এসকল প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ নার্স ও টেকনিশিয়ান থাকলে তাদের অর্থদ- না দিয়ে নির্দিষ্ট নার্স ও টেকনিশিয়ানকে পূর্ণ সময় পড়ার বৃত্তি প্রদান করা এবং পড়ালেখা শেষে ঐ প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৫ বছর সার্ভিস প্রদান নিশ্চিত করা।
৯. প্রত্যেক হাসপাতাল থেকে সৎ, দক্ষ ও পরোপকারী অফিসারদের তথ্য গোপনে সংগ্রহ করে তাদের সাথে মতবিনিময় করা।
১০. অপচিকিৎসা বন্ধ ও এন্টিবায়োটিক রেজিস্টান্সের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া
১১. সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকা-, ভূমিকম্প, মাদক, মারামারি, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ ও ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ, দিনশেষে ঐসকল বিভাগের ব্যর্থতার দায় স্বাস্থ্য বিভাগকেই নিতে হয়।
১২. সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ঔষধ প্রদান করতে হবে। ঔষধ কোম্পানির ‘রঙ্গিন লিটারেচার’ নিষিদ্ধ করে প্রচারের জন্য সাদাকালো বুকলেট ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে।
১৩. সংক্রামক রোগ যেমন ডেঙ্গু, টিবি, কালাজ¦র, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে বাহক বা ভেক্টর কন্ট্রোলে অগ্রিম কার্যকর পদক্ষেপ জোড়দার করতে হবে।
১৪. হেলথ পুলিশ এবং হেলথ লিগ্যাল উইং চালু করা। সকল পর্যায়ে ফরেনসিক বিভাগ হেলথ পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত করা।
১৫. কেয়ার গিভারসহ জেরিয়াট্রিক বিভাগ চালু করা।
১৬. কাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রত্যেক জেলায় ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যাথল্যাব, ডায়ালাইসিসসহ ওঈট, ঐউট-সহ হাসপাতাল নির্মাণ করে লোকবল নিয়োগ দেয়া।
১৭. দক্ষ নার্স তৈরিতে প্রত্যেক নার্সিং কলেজে কার্ডিয়াক নার্সিং, আইসিইউ নার্সিং, এইচডিইউ নাসিং, বার্ন নাসিং, সার্জারি নার্সিং এবং কেয়ার গিভার নার্সিং কোর্স চালু করা এবং প্রত্যেক হাসপাতালে প্রত্যেক বিভাগে পর্যাপ্ত নার্স নিয়োগ দেয়া।
১৮. স্বাস্থ্য খাতের প্রধান সমস্যা প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ এবং হাসপাতালের সেবা কার্যক্রমে জড়িত বিভিন্ন দপ্তরসমূহ যেমন ডাক্তারদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, কেনাকাটা ও মেরামত, এসব কিছুর পরিচালনা সিভিল সার্ভিসের উপর। আবার হাসপাতালের সামগ্রিক সেবা কার্যক্রম এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিেিটড, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর/গণপূর্ত অধিদপ্তর, সিএসএসডি, মেডিক্যাল ইকুপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স অর্গানাইজেশনের (টেমো) মতো অনেকগুলো সরকারি দপ্তরের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এই জটিল ইকোসিস্টেমের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা প্রয়োজন।
১৯. পাশাপাশি প্রয়োজন বর্তমান প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং এর বিধিমালা সংশোধন।
সবশেষে, সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগ প্রতিরোধ, শুধু চিকিৎসা নয়। পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, টিকাদান এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা এই বিষয়গুলোতে জনগণকে সচেতন করা গেলে অনেক রোগের প্রকোপ আগেই কমিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যখাতে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি মানবিক, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাও।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।