অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি জয় বদলে দিতে পারে শুধু একটি সিরিজের গল্প নয়, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পুরো হিসাব।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ যে চমক দেখিয়েছে, তার প্রভাব এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকাতেও। অস্ট্রেলিয়া এখনো শীর্ষে। কিন্তু তাদের পথ এখন আর আগের মতো নিশ্চিত নয়।
আর বাংলাদেশের সামনে রয়েছে আরো বড় একটি সুযোগ।
যদিও শনিবার ম্যাকে টেস্টে প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৪ রানেই অলআউট হয়ে গেছে বাংলাদেশের দল। টেস্ট ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ।
কিন্তু টেস্টের ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত ফলাফল কি দাঁড়াবে, সেটা এখনি বলা কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ার কাছে এই টেস্ট হেরে গেলে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানে খুব বেশি অদলবদল ঘটবে না। তবে ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্ট জিততে পারলে সিরিজ জয়ের পাশাপাশি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়েও বাংলাদেশ উঠে আসবে আরো শক্ত অবস্থানে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো একটি ইতিহাস।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে শেষবার হোয়াইটওয়াশ করেছিল ইংল্যান্ড। ১৮৮৬-৮৭ সালের অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ড ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল। এরপর ১৮৮৭-৮৮ সালের অ্যাশেজে একটি টেস্টেও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল তারা।
এরপর থেকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দুই টেস্টের সিরিজে কোনো দলই অস্ট্রেলিয়াকে পুরো সিরিজে হারাতে পারেনি। অর্থাৎ প্রায় ১৪০ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন ঘটনা ঘটেনি।
এবার সেই ইতিহাসের সামনে বাংলাদেশ। ডারউইনে প্রথম টেস্ট জয়ের পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, বাংলাদেশ এখানে একটি টেস্ট খেলতে আসেনি। তারা এসেছে দুটি টেস্ট খেলতে।
কথাটা এখন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ ম্যাকেতে বাংলাদেশ জিতলে শুধু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ই হবে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের পথও অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ফাইনালের দৌড়ে বাংলাদেশের নতুন সমীকরণ
ডারউইনের জয় বাংলাদেশের অবস্থানকে একেবারে বদলে দিয়েছে। পাঁচটি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ জিতেছে তিনটি। হেরেছে একটি। আর একটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। ফলে বাংলাদেশের পয়েন্টের হার এখন ৬৬.৬৭ শতাংশ।
সামনে বাংলাদেশের আরো সাতটি টেস্ট।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে দুটি টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দুটি এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আরো দুটি টেস্ট।
এই সূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সাতটি টেস্টের চারটি হবে বাংলাদেশের মাটিতে।
এটাই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্টের হিসাবে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে বাংলাদেশের আরো ৪৭ পয়েন্ট দরকার। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি টেস্টই জিততে পারলে বাংলাদেশ সেই ৬০ শতাংশের সীমা পেরিয়ে যাবে।
কিন্তু বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু ৬০ শতাংশ হওয়া নয়। কারণ ফাইনালে যেতে হলে শেষ পর্যন্ত অন্য দলগুলোর ফলও বিবেচনায় আসবে।
চারটি ঘরের ম্যাচ জেতার পাশাপাশি আরো একটি টেস্ট জিততে পারলে বাংলাদেশের পয়েন্টের হার উঠে যাবে প্রায় ৬৯.৪৪ শতাংশে।
সেই অবস্থায় ফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
আর যদি বাংলাদেশ সামনে থাকা সাতটি টেস্টের পাঁচটি জিততে পারে, তাহলে তারা এমন একটি অবস্থানে যাবে যেখানে ফাইনালের হিসাব অনেকটাই নিজেদের হাতে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশকে শুধু ভালো খেললেই হবে না। নিয়মিত জিততে হবে।
ডারউইনে বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম কারণ ছিল বোলারদের অসাধারণ ধারাবাহিকতা। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১০টি উইকেটই নিয়েছিলেন বাংলাদেশের পেসাররা।
লাইন ও লেংথ ধরে রেখে তারা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করেছেন। এরপর ব্যাটাররা দেখিয়েছেন অসাধারণ ধৈর্য।
ম্যাকেতে অস্ট্রেলিয়া ফিরবে আরো কঠিন হয়ে
ডারউইনের পর অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই নিজেদের ভুলগুলো নিয়ে ভাবছে। বাংলাদেশ কোচ ফিল সিমন্সও জানেন, দ্বিতীয় টেস্টে একই অস্ট্রেলিয়াকে পাওয়া যাবে না।
ম্যাকেতে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া থাকবে স্বাগতিকরা। প্রথম ইনিংসে তারা সেই নজির দেখিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া কখনো দুই টেস্টের ঘরের সিরিজে দুই ম্যাচই হারেনি সেই ১৮৮৬-৮৭ সালের পর থেকে। ফলে বাংলাদেশের সামনে শুধু সিরিজ জয়ের সুযোগ নয়, ইতিহাস বদলে দেয়ার সুযোগও রয়েছে।
ম্যাকেতে দ্বিতীয় টেস্টে- মিচেল স্টার্কের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ১০ ওভারেই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশ। প্রথম দিন দুপুরের পর ম্যাকেতে বাংলাদেশ মাত্র ৩৪ ওভার ব্যাট করে অলআউট হয়। টেস্ট ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই দ্বিতীয় টেস্টটি জয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি জয় তাদের সিরিজ জেতাবে।
একইসাথে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়েও অনেকটা এগিয়ে দেবে। আর একটি হার অস্ট্রেলিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেবে।
এই কারণেই ম্যাকের ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি টেস্ট নয়। এটি হতে পারে তাদের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর একটি।
অস্ট্রেলিয়ার ফাইনালের পথ কঠিন হয়ে গেল
ডারউইনের আগে অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালের সবচেয়ে বড় দাবিদার মনে হচ্ছিল। এখনো তারা তালিকার শীর্ষে। নয়টি টেস্টে তাদের জয় সাতটি। হার দুটি। পয়েন্টের হার ৭৭.৭৮ শতাংশ।
কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সময়।
অস্ট্রেলিয়ার বাকি ১৩টি টেস্টের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে তিনটি টেস্ট। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি। আর ভারতের মাটিতে পাঁচটি টেস্ট।
বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের সিরিজটি অস্ট্রেলিয়ার জন্য বড় পরীক্ষা।
ভারতের মাটিতে শেষ ১২টি টেস্টের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া জিতেছে মাত্র দুটি। অর্থাৎ শীর্ষে থেকেও অস্ট্রেলিয়া এখন আর নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না। ৬০ শতাংশ পয়েন্টের হার ধরে রাখতে তাদের বাকি ম্যাচগুলো থেকে ৭৫ পয়েন্ট দরকার। ছয়টি জয় এবং একটি ড্র পেলেই তারা সেই সীমায় পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু ফাইনালে উঠতে সম্ভবত আরও বেশি কিছু করতে হবে।
ডারউইনের হার তাই অস্ট্রেলিয়ার জন্য শুধু একটি পরাজয় নয়। এটি পুরো প্রতিযোগিতার সমীকরণকে খুলে দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের কী অবস্থা
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড।
দক্ষিণ আফ্রিকা চার টেস্টের তিনটিতে জিতে পয়েন্ট শতাংশে আছে ৭৫, আর সামনের ১০ টেস্টের আটটিই তারা খেলবে নিজেদের মাঠে- অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
উপমহাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পারফরম্যান্স বেশ ভালো, বিশেষ করে ভারতের মাটিতে সিরিজ জয় সেটির প্রমাণ। বাকি ম্যাচগুলোয় মোটামুটি ভালো ফল করলেই তারা ফাইনালের যোগ্যতা অর্জনের সীমা পেরিয়ে যাবে।
নিউজিল্যান্ডও আছে শক্ত অবস্থানে, তাদের পয়েন্ট শতাংশ এখন ৭২.২২।
সামনে ভারত ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঘরের মাঠে খেলা তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা, যদিও অস্ট্রেলিয়া সফরের চার টেস্টের সিরিজ হতে পারে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সিরিজে ভালো ফল করলে ফাইনালের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে তাদের জন্য।
অন্যদিকে গলেতে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে লড়াইয়ে ফিরেছে ভারত, তাদের পয়েন্ট শতাংশ এখন ৫৩.৩৩।
তবে সামনে ভারতের জন্য অপেক্ষা করছে সবচেয়ে কঠিন সূচি- আট টেস্টের মধ্যে সাতটিই খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো শীর্ষস্থানীয় দলের বিপক্ষে, যার মধ্যে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের সিরিজই হতে পারে নির্ণায়ক।
ফাইনালে যেতে হলে ভারতকে প্রায় নিখুঁত ক্রিকেট খেলতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ড এখন তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায়, আর ভারতের জন্য পথ কঠিন হলেও একেবারে বন্ধ নয়।
চক্রের শেষ দিকের সিরিজগুলোই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেবে ফাইনালে কারা মুখোমুখি হবে।
সূত্র : বিবিসি