২০২০ সালের ১৫ জুন, খুলনায় একজন রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন রোগীর স্বজনেরা। সেই রাতে চিকিৎসক ডা. আবদুর রকিব খান রোগীর স্বজনদের হামলার শিকার হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মারধরে গুরুতর আহত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ডা. রকিব তখন খুলনার রাইসা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক ছিলেন। একজন চিকিৎসক নিজের কর্মস্থলে রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে রোগীর স্বজনদের হাতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারালেন। এই একটি ঘটনাই বাংলাদেশের হাসপাতাল নিরাপত্তাব্যবস্থা আমূল পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছয় বছর পরও আমাদের একই প্রশ্ন করতে হচ্ছে- ডা. রকিবের মৃত্যু থেকে আমরা আসলে কী শিখেছি?
বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসার ফল প্রত্যাশিত না হওয়া, হাসপাতালে শয্যা বা আইসিইউ না পাওয়া, চিকিৎসা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার পর অনেক সময় রোগীর স্বজনদের ক্ষোভ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর গিয়ে পড়ে। ঘটনাগুলোর পরিণতিও প্রায় একই রকম। হামলা হয়, ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসকেরা প্রতিবাদ বা কর্মবিরতিতে যান, প্রশাসন বৈঠক করে, নিরাপত্তা বাড়ানোর আশ্বাস দেয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রæতি দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর চিকিৎসকেরা রোগীদের কথা বিবেচনা করে কাজে ফিরে যান। তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়Ñপরবর্তী হামলা না হওয়া পর্যন্ত। এই চক্রটি ভাঙতে হবে।
রোগীর মৃত্যু মানেই চিকিৎসকের অপরাধ নয় : চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক উন্নত হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান অমরত্ব দিতে পারে না। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, সেপসিস, বড় দুর্ঘটনা, অগ্রসর ক্যান্সার, মাল্টি-অর্গান ফেইলিউর অথবা অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারের পর সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়েও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। অবশ্যই চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলা হতে পারে। রোগীর পরিবারের অভিযোগ করার অধিকার থাকতে হবে এবং সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ, দ্রæত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত হওয়া উচিত। চিকিৎসকের পেশাগত অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও পেশাগত বিধি অনুযায়ী তার বিচার হতে হবে। কিন্তু চিকিৎসায় ভুল হয়েছে কি না, তার বিচার হাসপাতালের করিডরে লাঠি, ঘুষি বা দলবদ্ধ হামলার মাধ্যমে হতে পারে না। কোনো সভ্যসমাজে রোগীর মৃত্যু কাউকে চিকিৎসককে মারধরের লাইসেন্স দেয় না।
হাসপাতাল কোনো উন্মুক্ত জনসমাবেশের জায়গা নয় : বাংলাদেশের হাসপাতাল নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ। একজন রোগীর সঙ্গে কখনো পাঁচ, দশ বা তারও বেশি স্বজন হাসপাতালে প্রবেশ করেন। ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ, করিডোর-এমনকি চিকিৎসকদের কাজের জায়গার কাছেও অপ্রয়োজনীয় ভিড় দেখা যায়। সংকটাপন্ন রোগীর মৃত্যুর পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই ভিড় একটি উত্তেজিত জনতায় পরিণত হতে পারে। এটি শুধু চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয় নয়। অনিয়ন্ত্রিত দর্শনার্থী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে, রোগীর গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করে এবং চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত করে। তাই সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতালে কঠোর Access Control Szstem চালু করা জরুরি। একজন ভর্তি রোগীর জন্য সীমিতসংখ্যক visitor pass থাকতে হবে। ওয়ার্ডে একসঙ্গে একজন বা সর্বোচ্চ দুজন দর্শনার্থীর বেশি প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত নয়। ICU, OT, emergency resuscitation area এবং অন্যান্য restricted clinical zone-এ অনুমোদন ছাড়া প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। বড় হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে electronic access card, visitor identification system এবং security checkpoint চালু করা যেতে পারে।
শুধু আনসার দিয়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না : আনসার সদস্যদের অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বৃহৎ tertiary-care hospital-এর নিরাপত্তা সাধারণ গেট পাহারার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। একটি বড় হাসপাতালে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াত হয়। সেখানে রয়েছে জরুরি বিভাগ, ICU, অপারেশন থিয়েটার, emergency, angry relatives, intoxicated individuals এবং কখনো দলবদ্ধ সংঘর্ষের ঝুঁকি। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজন বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত professional hospital security team। বড় হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা কার্যকর Security Control Room থাকতে হবে। জরুরি বিভাগ, ICU, প্রধান ওয়ার্ড, প্রবেশপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলো CCTV-এর আওতায় আনতে হবে। নিরাপত্তাকর্মীদের শুধু ঘটনার পর উপস্থিত হলে হবে না; ঝুঁকি শনাক্ত করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশের হাসপাতালে ‘Code White’ চালু করা প্রয়োজন : বিশ্বের অনেক হাসপাতাল ব্যবস্থায় violence, threat বা aggressive behaviour মোকাবিলায় নির্দিষ্ট emergency response protocol রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের পরিস্থিতিকে Code White বলা হয়। বাংলাদেশে একই নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু একটি জাতীয় Hospital Violence Response Protocol থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোনো চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী যদি দেখেন রোগীর স্বজনেরা উত্তেজিত হয়ে উঠছেন, হুমকি দিচ্ছেন বা সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন একটি নির্দিষ্ট নম্বর, panic button অথবা emergency alert-এর মাধ্যমে নিরাপত্তা দলকে ডাকা যাবে। Public Announcement System-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট code ঘোষণা হবে এবং প্রশিক্ষিত security response team কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। প্রয়োজন হলে Security Control Room থেকেই পুলিশকে জানানো হবে। এ ব্যবস্থা কাগজে লিখে রাখলেই হবে না। Fire drill-এর মতো নিয়মিত Code White drill করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, নিরাপত্তাকর্মী এবং হাসপাতাল প্রশাসন-সবাইকে জানতে হবে জরুরি পরিস্থিতিতে কে কী করবেন।
প্রতিটি হাসপাতালে দৃশ্যমান সতর্কবার্তা থাকতে হবে : প্রতিরোধের আরেকটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো হাসপাতালের সর্বত্র স্পষ্ট সতর্কবার্তা প্রদর্শন। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথ, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, ICU এবং waiting area-তে বড় অক্ষরে পোস্টার টাঙানো উচিত। সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে পারে- ‘চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, গালাগাল, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা শারীরিক আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ এ ধরনের বার্তা শুধু দেয়াল সাজানোর জন্য নয়। এটি রোগী ও স্বজনদের শুরুতেই পরিষ্কার করে দেবে-হাসপাতালে অসন্তোষ বা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আছে, কিন্তু অপমান বা সহিংসতার কোনো জায়গা নেই। পোস্টারে হাসপাতালের Security Control Room-এর নম্বর, complaint desk-এর তথ্য এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও উল্লেখ করা উচিত। রোগীর অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে। সম্মানজনক আচরণ সেই দায়িত্বের অংশ। (চলবে)
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর