সম্প্রতি জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাসের সংক্রমণজনিত তীব্র লিভার ফেইলিউরের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। কারিনা কায়সারের মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকেরা অনিরাপদ খাদ্য ও দূষিত পানিকে দায়ী করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যানুযায়ী, পানিতে মলের জীবাণুর উপস্থিতি, অস্বাস্থ্যকর উপায়ে তৈরি খাবার বা ধোয়া হয়নি এমন কাঁচা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করে। হোটেল-রেস্তোরাঁ বা স্ট্রিট ফুডে ব্যবহৃত অনিরাপদ পানি, পচা-বাসি উপাদান এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এই ধরনের প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান উৎস। হেপাটাইটিসের মতো ভাইরাস আক্রমণ করলে লিভার দ্রুত কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যা কারিনার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। কারিনার মৃত্যু জনমনে বেশ নাড়া দিয়েছিল। বিশেষ করে কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা একাধিক ভিডিও ছেড়েছিল কারিনার মৃত্যুর উৎস খুঁজতে। মিডিয়াগুলোও অনেক প্রতিবেদন করেছিল। কিন্তু তাতে কি হয়েছে? স্ট্রিট ফুডের খাদ্য নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? হোটেল রেস্টুরেন্টের খাবার তৈরিতে অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা হয়েছে? রাস্তার পাশের ফুচকা, ভেলপুরি, ভাঁজাপোড়া, চা-নাস্তার দোকানের খাবারের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয়েছে? জনগণ কি এসকল খাবার এড়িয়ে চলছে? কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে এগুলো মেনে চলার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ কি নেওয়া হয়েছে? এগুলোর সকল প্রশ্নের উত্তর হবে ‘না’। অর্থাৎ খাদ্যে ভেজাল মেশানো বন্ধ কিংবা খাদ্য তৈরিতে হাইজেন মেইন্টেইন করার কোন নিয়মনীতি আমাদের দেশের হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা ফাস্টফুডের দোকানে অনুসরণ করা হয়না। কারিনা কায়সার কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ছিল বলে তার বিষয়টি বেশ ফলাও করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু কারিনা কায়সারের মত লক্ষ লক্ষ রোগী দেশে আছে তাতে কোন সন্দেহে নেই।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা হলো খাদ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, সুস্থ জীবন এবং চিন্তাশীল মন গঠনের প্রধান জ্বালানি হলো বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে উন্নয়ন আর অগ্রগতির চাকাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে একটি নীরব ঘাতক খাদ্যে ভেজাল। পৃথিবীতে দ্বিতীয় এমন কোন দেশ আছে কিনা আমার জানা নেই, যেখানে মানুষের গৃহীত খাদ্যে মানুষই নিজ হাতে ভেজাল তথা বিষ মেশায়। বর্তমানে এটি এখন আর কেবল একটি নৈতিক স্খলন বা বিচ্ছিন্ন অপরাধের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি জাতীয় দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। এটি জোর গলায় বলা যায়, সকালের নাস্তার টেবিল থেকে শুরু করে রাতের শেষ খাবার সবকিছুতেই মিশে আছে বিষাক্ত রাসায়নিকের অদৃশ্য থাবা। এই পরিস্থিতি আমাদের জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পরীক্ষা করা খাদ্য নমুনার প্রায় ৩৩.৩ শতাংশই অনিরাপদ বা ভেজালযুক্ত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজার থেকে সংগৃহীত মাছ, দুধ ও শাকসবজির মতো অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের একটি বড় অংশেই মারাত্মক মাত্রায় দূষণ মিলছে। এসব সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিষাক্ত সাইক্লোমেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে টোস্ট বিস্কুট, বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা, আনারস। রুটি, বিস্কুট, সেমাই তৈরি করা হচ্ছে বিষাক্ত উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। ক্যানসার সৃষ্টিকারী ফরমালিন দেওয়া হচ্ছে মাছ-সবজিতে। মবিল দিয়ে ভাজা হচ্ছে চানাচুর, হাইড্রোজ মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মুড়ি ও জিলাপি। এ ছাড়া টেক্সটাইল রং দেওয়া হচ্ছে বেকারি পণ্য, জুসসহ ডাল, ডালডা ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। অপরিশোধিত পামঅয়েল মিশ্রিত সয়াবিন তেল, ভেজাল দেওয়া সরিষার তেল, রং ও ভেজালমিশ্রিত ঘি, পামঅয়েল মিশ্রিত কনডেন্সড মিল্ক, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি প্যাকেটজাত জুস, মিনারেল ওয়াটার, তরল দুধে ইউরিয়া ও ডিটারজেন্ট ও ক্ষতিকারক ফ্লেভার ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরি, হোটেল-রেস্টুরেন্টে বাসি, মরা মুরগি, খাওয়ানোর ঘটনাও ঘটছে। শুধু তা-ই নয়, বাজারে প্রাপ্ত গুঁড়ো মশলায় কাপড়ের টেক্সটাইল রঙ, কাঠের গুঁড়ো এবং ইটের বালু মেশানোর মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। ফসলে ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ভেজালের এসব উপকরণসহ অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। এর পরও ভেজালের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এই বিষাক্ত বৃত্তের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নিজের অজান্তেই বিষ খাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের ওপর মরণঘাতী প্রভাব খাদ্যে ভেজালের প্রভাব তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি উভয়ভাবেই মানবদেহে প্রকাশ পায়। বাসি ও জীবাণুযুক্ত খাবার থেকে পেটের পীড়া বা ডায়রিয়া হওয়া খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু যখন ধীরগতির বিষ হিসেবে হেভি মেটাল (সীসা, ক্রোমিয়াম), টেক্সটাইলের রঙ বা ফরমালিন শরীরে প্রবেশ করে, তখন তার পরিণতি হয় ভয়াবহ। দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন ক্যানসার, লিভার সিরোসিস এবং কিডনি বিকল হওয়া রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, কিডনি ফেইলিওর এবং পাকস্থলীর ক্যানসারের এই উল্লম্ফনের পেছনে মূল অপরাধী হলো খাদ্যের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে রাসায়নিক গ্রহণ করা। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে শিশুদের ওপর। দুগ্ধজাত পণ্য এবং গুঁড়ো দুধে ভেজালের কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গর্ভবতী মায়েরা এই বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে এমন সব শিশু জন্ম দিচ্ছে যারা জন্মগতভাবেই হৃদরোগ, বিকলাঙ্গতা বা মানসিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে। অর্থাৎ একটি নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার শরীরে মারাত্মক সব রোগ বাসা বাঁধছে। একটি মেধাহীন ও রুগ্ন প্রজন্ম নিয়ে কোনো দেশই উন্নত বিশ্বের সুউচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে না। অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈশ্বিক প্রভাব খাদ্যে ভেজালের ক্ষতি কেবল হাসপাতালের বিল পরিশোধেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কেবল অনিরাপদ খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে, যা অঙ্কের হিসাবে শত শত কোটি টাকা। কোটি কোটি মানুষ প্রতি বছর খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। এর আন্তর্জাতিক মাত্রাও রয়েছে। খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ তার কৃষি ও খাদ্যপণ্য ইউরোপ বা আমেরিকার মতো লাভজনক বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না। চিংড়ি বা অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের উপস্থিতির কারণে প্রায়শই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমাদের পণ্য ফেরত আসে, যা দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
আইনি অবকাঠামো এবং প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাবাংলাদেশে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং মোটা অঙ্কের জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে লাখ লাখ টাকা জরিমানা করছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও অপরাধ কমছে না। এর মূল কারণ আইনের ফাঁকফোকর এবং নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির অভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযান কেবল কিছু জরিমানা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা বড় অসাধু চক্রের কাছে খুবই সামান্য। প্রতিটি জেলায় ডেডিকেটেড খাদ্য আদালত এবং পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি না থাকায় অপরাধীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। খাদ্যে ভেজালের এই ভয়াবহ আগ্রাসন রুখতে হলে বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেবল জরিমানা নয়, খাদ্যে বিষ মেশানোর মতো জঘন্য অপরাধের জন্য লাইসেন্স বাতিল এবং দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ে খাদ্য পরীক্ষার জন্য আধুনিক ও পোর্টেবল টেস্টিং কিটের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে ভেজাল শনাক্ত করা যায়। রঙের নামে খাবারে বিষ মেশানো কোনমতেই সমীচীন নয়। শুধুমাত্র ক্রেতা আকর্ষণের জন্য হীন মানের কাজে ব্যবসায়ীরা পিছপা হয়না। এই নোংরা মানসিকতা থেকে ব্যাবসায়ীদের বের হতে হবে। সেই সাথে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাসমূহের নিয়মিতহারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ফসলে কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার এবং খাদ্য সংরক্ষণের নিরাপদ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে উৎপাদনকারীদের সচেতন করতে হবে। সাধারণ মানুষদেরও সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা চকচকে খাদ্যদ্রব্য পরিহার করে এবং সন্দেহজনক খাবার বর্জন করে অসাধু ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি আইনি দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন। আমরা যদি এখনই এই নীরব মহামারির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে এক রুগ্ন ও পঙ্গু ভবিষ্যৎ আমাদের গ্রাস করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে এক মুঠো নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য তুলে দেওয়ার নিশ্চয়তা আমাদের আজই করতে হবে।
একসময় দেশে খাদ্যের অভাব ছিল। তখন দাবি ছিল, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। খাদ্য ঘাটতি কমে বর্তমানে আমরা খাদ্যে মোটামুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে খাদ্য উদ্বৃত্তও থাকে। কিন্তু পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের ঘাটতি রয়েই গেছে। মানুষের বর্তমানে ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। খাদ্য সুষম হলে উচ্চমূল্যেও ক্রয় করার সামর্থ্য মানুষের রয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে মানুষ উচ্চ মূল্য পরিশোধ করেও সুষম খাদ্য পাচ্ছে না। তাই খাদ্য নিয়ে নতুন ধারণার সূচনা হলো, ‘নিরাপদ খাদ্য’। ‘খাদ্য নিরাপদ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে না, বরং আরো দীর্ঘমেয়াদি রোগের সৃষ্টি করে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অসংক্রামক রোগ, যেমন: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, ক্যানসার ইত্যাদি। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুদ রাখা, আকর্ষণীয় করাসহ নানাভাবে নিরাপদ না হলে যেকোনো মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বর্তমান সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ৬১ শতাংশ কারণ অসংক্রামক রোগ। কিন্তু অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধযোগ্য। এ রোগ জীবনযাপনের ধরন এবং খাদ্যের অভ্যাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্ট্রিট ফুড ও ফাস্ট ফুড শিশু, তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে যেকোন বয়সের মানুষের কাছে অধিক পছন্দের। দেশীয় স্ট্রিট ফুডের পাশাপাশি বাইরের দেশের স্ট্রিট ফুডের ও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে এদেশের ফুড লাভারদের কাছে। এসব খাদ্যের অধিকাংশই বিষাক্ত কেমিক্যাল, রঙ, অস্থাস্থ্যকর তেল, ডালডা, দূষিত পানি দিয়ে তৈরি। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে ভোক্তাদের ফ্যাটি লিভার, উচ্চ মাত্রার কোলেস্ট্রল, উচ্চ রক্তচাপ সহ নানা ধরনের ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্লো-পয়জনিং এর মত বিষাক্ত এসব উপাদান মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর দৌরাত্ম্যের লাগাম যদি এখনি টেনে না ধরা হয় তাহলে আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে এক অশনিসংকেত। নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে আসছে শরীরে রোগ নিয়ে। কোটি কোটি মানুষ ফ্যাটি লিভার, উচ্চ কোলেস্ট্রল, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ নানা ধরনের জটিল রোগে ভুগছে। এটি একটি দেশের জন্য কখনো ভালো ইঙ্গিত নয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্বের ভিতর পড়ে। বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারিত দপ্তরকে স্ব প্রণোদিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। খাদ্যে মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসমূহের একযোগে কাজ করতে হবে। ভেজাল বিরোধী অভিযানকে ত্বরান্বিত করতে হবে। ভেজাল মেশানোকারীকে আইনের আওতায় এনে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম, খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। কিন্তু পচা, বাসি, ভেজাল বা বিষাক্ত দ্রব্য মানুষের খাদ্য হতে পারে না। এটা মানবদেহের জন্য বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোটা রীতিমতো অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভেজালের বেপরোয়া দাপটের মধ্যে আসল পণ্য খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর। এমন জটিল ও সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় খাদ্যে ভেজাল দেওয়া হয়, যা সাধারণ ক্রেতা বা খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে অনুমান বা শনাক্ত করাও খুব কঠিন। সম্প্রতি এর ব্যাপ্তি যে হারে বাড়ছে তাতে আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। দেশি ও আন্তর্জাতিক সব গবেষণায় দেশে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি বারবার উঠে আসছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। একটি সুস্থ সবল জাতি উপহার দিতে হলে এখানেই ভেজালের ইতি টানতে হবে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট।
[email protected]