ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হলো।
মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মের্ক ও মডার্না’র যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ব্যক্তিগতকৃত ক্যানসার ভ্যাকসিন মেলানোমা (এক ধরণের ত্বকের ক্যানসার) রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসা বন্ধ করতে বড় ধরনের সফলতা দেখিয়েছে। গবেষকদের আশা, এই সফলতা ভবিষ্যতে আরও নানা ধরনের টিউমার ও ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।
সাধারণ কেমোথেরাপি ক্যানসার কোষের পাশাপাশি শরীরের সুস্থ কোষকেও ধ্বংস করে। আবার প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি সামগ্রিকভাবে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে। তবে এই নতুন এমআরএনএ ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। এটি প্রতিটি রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট জিনে থাকা পরিবর্তন বা মিউটেশনকে চিহ্নিত করতে এবং কেবল ওই ক্যানসার কোষগুলোকেই লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, মেলানোমা রোগীদের ক্যানসার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের পর প্রতি ৬ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৯টি ডোজে মের্কের ইমিউনোথেরাপি ওষুধ ‘কিট্রুডা’-র সঙ্গে কাস্টমাইজড এই ভ্যাকসিনটি দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের মূত্রনালির সংক্রমণ বেশি হয় কেন, কীভাবে ছড়ায় এই সংক্রমণ?

১,০০০-এরও বেশি মেলানোমা রোগীর ওপর পরিচালিত একটি বড় ট্রায়ালে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার আবার ফিরে আসার যে উচ্চ ঝুঁকি থাকে, তা দূর করতে এই কাস্টমাইজড ভ্যাকসিনটি অত্যন্ত কার্যকর।
পূর্ববর্তী এক গবেষণার পাঁচ বছরের তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র কিট্রুডা ব্যবহারের চেয়ে ভ্যাকসিনের ব্যবহারে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ এবং শরীরের অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি-র প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. জুলি গ্র্যালো এই সাফল্যকে ‘এক বিশাল অর্জন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসায় এমআরএনএ প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণিত হলো। অন্যদিকে, মডার্নার সভাপতি স্টিফেন হোজে জানিয়েছেন, অনুমোদনের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই হাজার হাজার মেলানোমা রোগী এর সুফল পাবেন।
নেই কোনো নতুন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শুধুমাত্র কিট্রুডা ব্যবহারে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ক্লান্তি, ডায়রিয়া, চামড়ায় ফুসকুড়ি বা জয়েন্টে প্রদাহের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু গবেষকরা জানিয়েছেন, নতুন এই ক্যানসার ভ্যাকসিনটি যোগ করার ফলে কোনো অতিরিক্ত বা নতুন ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সাধারণ ফ্লু বা কোভিডের টিকা দেওয়ার পর শরীরে যে হালকা প্রতিক্রিয়া হয়, এখানেও ঠিক তেমনই দেখা গেছে।
শুধু মেলানোমা নয়, মের্ক ও মডার্না ইতোমধ্যে ফুসফুসের ক্যানসার (নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার)-এর ওপরও গভীর পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। এ ছাড়া মূত্রথলি (ব্লাডার), কিডনি, অগ্ন্যাশয় (প্যানক্রিয়াস) এবং পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চলছে। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে এগুলোর ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, রোশ ও বায়োএনটেক-ও তাদের নিজস্ব এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোলন ক্যানসার এবং প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসারের চিকিৎসায় ট্রায়াল চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলাফল ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেলানোমার এই সফলতা ক্যানসার গবেষণাকে এক অভূতপূর্ব গতি দেবে।