বিশ্বজুড়ে আমাদের বাসন থেকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময় হরেক পদের শাকসবজি। আর এই নিশব্দ বিলুপ্তি অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে গুড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা।

বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যালার্ট’ রোববার (৯ আগস্ট) এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পুষ্টি, কৃষি ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছেন। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান সবজির বৈচিত্র্য রক্ষা করা না গেলে মানুষের স্বাস্থ্য আর পৃথিবীর পরিবেশ—কোনোটাই রক্ষা করা যাবে না।

ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টারে কর্মরত থাকাকালে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দেন কৃষিবিজ্ঞানী মার্টেন ভ্যান জোনভেল্ড। গবেষণার সারমর্ম তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমান প্রথাগত কৃষিপদ্ধতি দিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া পুষ্টিসংকট মেটানো সম্ভব নয়। জোনভেল্ডের ভাষায়, 'সমাধান কেবল বেশি করে সবজি উৎপাদনের মধ্যে লুকিয়ে নেই, আসল সমাধান লুকিয়ে আছে হরেক জাতের সবজি ফলানোর মাঝে।'

তিনি আরো সতর্ক করেন, আমাদের প্রয়োজনীয় সবজির বিপুল বৈচিত্র্য এখনো প্রকৃতিতে রয়ে গেছে—বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী সবজির জাত ও বুনো প্রজাতির মধ্যে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ধাক্কা সামলে পুষ্টির জোগান ঠিক রাখতে এখনই এগুলোর সঠিক সংরক্ষণ প্রয়োজন, যেন তা আমরা কার্যকরভাবে চাষে ব্যবহার করতে পারি।

আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, একটি সুস্থ ও সুস্থ্য জীবনের জন্য দৈনিক যে পরিমাণ শাকসবজি খাওয়া প্রয়োজন, বিশ্বজুড়ে মানুষ গড়ে তার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম সবজি গ্রহণ করছে। অথচ পুষ্টির ঘাটতিই বর্তমানে বৈশ্বিক রোগব্যাধির প্রধান পাঁচটি কারণের একটি। একদিকে পকেটের টান পড়লে মানুষ বাজার থেকে সবার আগে সবজির পরিমাণ কমায়, অন্যদিকে পচনশীল ও স্বল্প মেয়াদি বলে কৃষকরাও সবজি চাষকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি মনে করেন।

কৃষির আধুনিক শিল্পায়নের আগে খাবার টেবিলে হাজারো জাতের উদ্ভিদের মেলা বসত। কিন্তু গণউৎপাদন, একমুখী ফসল চাষ (মনোকালচার) এবং জেনেটিক পরিবর্তনের যাঁতাকলে পড়ে সেই বৈচিত্র্য আজ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার পথে। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীতে আলুর প্রজাতি ৪ হাজারের বেশি, অথচ উন্নত বিশ্বেও মাত্র ৫ থেকে ৮টি জাতের আলুর একচ্ছত্র প্রভাব চলছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-র পর্যালোচনা অনুযায়ী, অন্তত ২৪ শতাংশ বুনো সবজি প্রজাতি চরম বিলুপ্তির মুখে। ফলে ফসলের জিনগত সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রাকৃতিক ক্ষমতাকেও নস্যাৎ করে দিচ্ছে।

বর্তমানে টমেটো, পেঁয়াজ ও লেটুসের মতো নির্দিষ্ট কয়েকটি সবজি সারা বিশ্বে রাজত্ব করলেও স্পাইডার প্ল্যান্ট (আফ্রিকান শাক), স্লিপারি ক্যাবেজ কিংবা বিটার গর্ড (করলা বা উচ্ছে)-এর মতো পুষ্টিকর সবজিগুলো আঞ্চলিক সীমারেখাতেই আটকে আছে। মিষ্টি কুমড়ার মতো খরা ও তাপসহনশীল ফসল থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর জাত সংরক্ষণে মনোযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—বিশ্বের অন্তত ১,৪৮০টিরও বেশি প্রজাতি হারানোর আগেই যদি স্থানীয় চাষিদের উদ্বুদ্ধ করা না হয় এবং সমন্বিত পদক্ষেপে বৈচিত্র্যময় সবজি কেনা ও খাওয়া না বাড়ে, তবে ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা মুখ থুবড়ে পড়বে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews