হাফিজ উদ্দিন আহমদ: কিছুই জানতাম না। আর আমি ঢাকায় এসেছি, মানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছি ১৬ মার্চ। ফলে এই যে মার্চের গোড়ার দিকে গণ–আন্দোলন, ২ তারিখে পতাকা উত্তোলন, ৭ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ইত্যাদি শোনার সুযোগ হয়নি। ১৬ তারিখে এসেছি। তবে জনগণ যে ক্ষুব্ধ, এটা বুঝতে পেরেছি এবং পার্লামেন্টের অধিবেশন যে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এ জন্য বাঙালিরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, এটা অনুভব করছি। তবে আসার পর সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় যাওয়ার ফলে বন্ধুবান্ধব বা কারও সঙ্গে আলাপসালাপের সুযোগ নেই। আমরা সামরিক বাহিনীর সেই কষ্টকর ট্রেনিং এক্সারসাইজগুলো সীমান্ত এলাকায় দিন নেই–রাত নেই হাঁটাহাঁটি করছি, আক্রমণ, রক্ষণ ইত্যাদি যুদ্ধের নানা কলাকৌশল সৈনিকদের নিয়ে রপ্ত করছি। শীতকালীন ট্রেনিং এক্সারসাইজ বলে এটাকে। এভাবে ২৯ তারিখ পর্যন্ত ছিলাম। ইতিমধ্যে ২৫ তারিখে যে একটা ক্র্যাকডাউন হয়েছে, এটা সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। মেজর জিয়াউর রহমান ২৬ তারিখে এবং পরে ২৭ তারিখে বেতার থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, এসব কিছুই জানতাম না। ২৯ তারিখে আমাদের ডেকে পাঠানো হলো ক্যান্টনমেন্টে। …হেঁটে গভীর রাতে ১২টার দিকে আমরা ক্যান্টনমেন্টে এলাম। আসার পরে আমরা যার যার অফিসার মেসে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছি। পরদিন সকালে সাড়ে সাতটার দিকে ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার দুররানি এলেন এবং নির্দেশ দিলেন—প্রথম ইস্ট বেঙ্গল আমার ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হলো। এর কারণ হলো, ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল জয়দেবপুরে, তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল সৈয়দপুরে, চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল কুমিল্লাতে এবং অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেছে। …যেহেতু অন্যদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, সর্বশেষ যখনই আমাদের ব্রিগেড কমান্ডার এসে নিরস্ত্র করলেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সৈনিকেরা সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে অস্ত্রাগার ভাঙি। ওই সময় একটা বিদ্রোহ হলো। কারণ সবাই ভেবেছে, এর (দুররানি) উদ্দেশ্য খুব খারাপ, এই সময় আমাদের কেন অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হবে আর এমনিতে তো ক্ষোভ আছেই। তখন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আট ঘণ্টাব্যাপী একটি যুদ্ধ হয়। এখানে আমার কমান্ডিং অফিসার বাঙালি ছিলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমরা কি করব?’ উনি স্মার্ট অফিসার। আমেরিকায় কোর্সটোর্স করে এসেছেন। আমরা খুব ভয় পেতাম তাঁকে; কিন্তু দেখা গেল যে ওই সংকট মুহূর্তে উনি সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না এবং অবিরল ধারায় অশ্রু নির্গত হচ্ছে। তাঁর কান্না দেখে আমি অবাক। বয়স্ক লোক, কাঁদছেন। গোলাগুলি চলছে, মর্টারে গোলা ফেলছে—এ সময় তো সৈনিকের রিঅ্যাকশন হবে যে লেট আস ফাইট ইট আউট বা তারা গুলি ছুড়লে আমরা একটা গুলি ছুড়ব—সেই জায়গায় কান্নাকাটি, এটা তো আর্মির ভোকাবুলারিতে পড়ে না। যখন দেখলাম যে উনি কিছু করছেন না, পরে আমি বাইরে আসার পর সৈনিকেরা আমাকে বলল, ‘স্যার, একজন অফিসার দরকার। আমরা বিদ্রোহ করেছি, আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেন।’ আমি বললাম যে কমান্ডিং অফিসার বাঙালি, তাঁর কাছে যান। বলে, ‘ওনাকে বলেছিলাম, কিন্তু উনার বয়স হয়েছে। বিদ্রোহ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।’ তাঁর পরই আমি সিনিয়র। আড়াই বছর চাকরির। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি আছি তো। আমি দুই–এক মিনিট চিন্তা করেছি একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে—গুলি চলছে তখন—যে আমি এই পাঁচজন অফিসারের সঙ্গেই অফিস রুমে বসে থাকব নাকি বাইরে যুদ্ধরত সৈনিকদের সঙ্গে যোগ দেব। মিনিট দুই চিন্তা করে ভাবলাম, সৈনিকদের সঙ্গেই থাকা ভালো। তখন ব্যাচেলর ছিলাম। কোনো পিছুটান ছিল না। সৈনিকদের সঙ্গে যুদ্ধে লেগে গেলাম। একজন বাঙালি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ছিল—আনোয়ার হোসেন। তাঁকে আমি ইশারা করে বাইরে ডেকে নিয়ে এলাম। বললাম যে ‘আমি তো বিদ্রোহীদের সঙ্গে আছি, তুমি কী করবে?’ আনোয়ার হোসেন বলে, ‘আমিও আছি আপনাদের সঙ্গে।’ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ইয়াং ছেলে। খুবই সাহসী। যুদ্ধের একপর্যায়ে তিনি শহীদ হন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews