জগৎ সংসারের মোহমায়ার অন্তর্জালের বিচিত্রতা নিয়তই মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বহু বেদনাভার, বহু কষ্ট নিয়ে আজকে যাঁর কথা লিখতে বসেছি, তিনি আমার কাছে আমার পরিবারের কাছে একজন সশ্রদ্ধ মর্যাদাপূর্ণ অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব; যাঁকে ইতোমধ্যে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। কী লিখব আর কোথা থেকে শুরু করব সেটা ভাবতেও লেগে গেল বেশ কয়েক দিন। একজন প্রবাদপ্রতিম, প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ, ধী-শক্তিসম্পন্ন, আড়ম্বরহীন, অতি সাধারণ্যে যাঁর বিচরণ ছিল অনন্য এবং প্রবল মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রফেসর ড. প্রদীপ কুমার রায়। নিজের জীবনকে তিনি তাঁর নামের সঙ্গেই অর্থবহ করে তুলেছেন। প্রথিতযশা এই অধ্যাপক ১৯৫২ সালের ২ অক্টোবর টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার বকরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে এমএ পাস করার পর ভারতের পুনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর শুরু করেন এক প্রজ্ঞাময়-জ্ঞানীয়, গবেষণাধর্মী এবং নিবিড় আত্মনিয়োগের সঙ্গে দার্শনিকতা জীবনের অনন্য পথচলা। আমরা তখন সবেমাত্র সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। বিভাগে দুটো টিউটোরিয়াল ক্লাসের মধ্যে একটা প্রফেসর ড. আমিনুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে, অন্যটি প্রদীপ স্যারের সঙ্গে। স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার এভাবেই মোক্ষম সুযোগটা তৈরি হয়েছিল।

সে সময়কার অনেক মেধাবী, গুণী শিক্ষক মণ্ডলী আমাদের ছিলেন, যাঁদের কৃতজ্ঞচিত্তে সারা জীবন মানসপটে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখব। তবে সব শিক্ষকের সঙ্গে সবার একই রকম ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় না। কারও কারও ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। প্রফেসর ড. প্রদীপ রায়ও ছিলেন সেরকম একজন ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষক। দর্শনের বহু বিষয় জটিলতায় পূর্ণ। আমরা তাঁর ক্লাসে সেসব জটিল বিষয়ের অবতারণা করে সমাধান পেতাম সহজেই।

সারা ক্লাস হেঁটে হেঁটে তিনি পাঠ বুঝিয়ে দিতেন। পরবর্তীতে স্যার দর্শন বিভাগে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং একসময় বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। বিভাগেও তিনি ছিলেন সবার প্রিয়জন এবং শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর নিষ্কাম জ্ঞানচর্চা আর মনস্বিতার পরিচয় মেলে শহীদ ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেবের বহুমাত্রিক কাজের মাধ্যমে। ড. দেবকে তিনি দেবতুল্য মানুষ এবং দর্শনের মহান পণ্ডিত জ্ঞানে কাজ করার মানসে ড. দেব সম্পর্কে দেশবিদেশ থেকে, তাঁর কাছের দূরের আত্মীয়-পরিজন থেকে এবং দেবের ঘনিষ্ঠজনদের থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দেবের ‘সমন্বয়ী ভাববাদকে’ প্রতিষ্ঠিত করেছেন আপন ভুবনের সুপরিসর আলোকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য ১৯২১-২০১১ গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধের ঊষালগ্নের প্রথম শহীদ ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেবের নামে। স্যারের কাজের পরিধি ব্যাপক এবং বিস্তৃত। নির্মোহ দৃষ্টির একজন সংবেদনশীল মানুষই শুধু ছিলেন না; তিনি ছিলেন তীক্ষè বোধশক্তিসম্পন্ন একজন মানবিক মানুষ। স্যার ছিলেন আমার এমফিল ডিগ্রির সুপারভাইজার। ড. দেবের ওপর কাজ করেছি আমি নিজেও। স্যারের সান্নিধ্যে এসে আমিও যেন একটু একটু করে বদলে যেতে শুরু করি। শুরুর গল্পটা বেশ মজার। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য কোনো বাছাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় না, যেটা দর্শন বিভাগের প্রচলিত নিয়ম। আমি দু-দুবার এই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে তৃতীয়বারে কৃতকার্য হয়ে প্রদীপ স্যারের আগ্রহে এবং আমার প্রয়াত স্বামীর আন্তরিক সদিচ্ছায়, চাকরির প্রায় ১৩ বছর পর এই অসাধ্য সাধনে প্রয়াসী হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী শিক্ষাছুটিসহ মঞ্জুরি কমিশনের বৃত্তিও পেয়েছিলাম আমি। এসব কাজে প্রয়াত ড. প্রদীপ কুমার রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। স্যারের কাছে ড. দেব যেমন দেবতুল্য, আমার এবং আমার পরিবারের কাছেও ড. প্রদীপ রায় ঋষিতুল্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ব্যস্ত জীবনের নিগড়ে আটকে পড়ে যেখন তখন যত্রতত্র দেখা হয়নি সত্য, কিন্তু আমি জানতাম জ্ঞানীয় জগতে, ইট-পাথরের সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের ভিড়ে আমার একজন প্রদীপ স্যার আছেন। আজ তাঁকেও চিরতরে হারিয়ে ফেললাম। স্যারের অসুস্থ অবস্থায় আমি নিজে যেমন গিয়েছি, তেমনি আমার ’৮৮ ব্যাচের বন্ধুরা স্যারকে দেখতে গিয়ে শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার নিদর্শন স্থাপন করেছেন। আমার দুর্ভাগ্য পিএইচডি ডিগ্রি আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব হয়নি, পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে। স্যার দেখা হলেই তাগাদা দিতেন। বলতেন, ‘মালেকা, পচা ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ছিল তুমি পিএইচডি করবে। আর কবে করবে? আমি মরে গেলে?’ আজও এই উচ্চারণের প্রতিধ্বনি আমার কানে প্রতিনিয়ত বেজে চলেছে। আমি কথা রাখতে পারিনি। স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এবং ইনস্টিটিউট অব বিজিনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশ দর্শন সমিতি, বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, মানিকগঞ্জ সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হিসেবেও তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশবিদেশের নামকরা বহু জার্নালে স্যারের দর্শনবিষয়ক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। শহীদ ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেবের বহুমাত্রিক বিষয় ছাড়াও নানান বিষয়ে প্রকাশনা, অনুবাদ গ্রন্থ- যেমন, ব্যবহারিক নীতিবিদ্যা; গোবিন্দচন্দ্র দেব : অগ্রন্থিত প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনা; পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস-দ্বিতীয় খণ্ড, জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি : গোবিন্দচন্দ্র দেব : জীবন ও দর্শন (যুগ্ম সম্পাদনা, ২০০৮) ইত্যাদি।

এ ছাড়াও ড. প্রদীপ কুমার রায়ের উল্লেখযোগ্য কর্মের অন্যতম হলো, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে তাঁর প্রকাশিতব্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ১৮ খণ্ডে বাঙালির দর্শনচর্চা। প্রদীপ বৌদি এবং তাঁর ছোট বোন মালবিকা বিশ্বাসের (সাবেক চেয়ারম্যান, সংস্কৃত বিভাগ) মুখ থেকে শুনেছি মৃত্যুশয্যায়ও স্যার বলেছেন, এখনো অনেক কাজ বাকি! হায়রে মৃত্যু! হায়রে নিয়তি! সৃষ্টির বিধান বড়ই নির্মম, সেখানে কোনো ক্ষমা নেই, পক্ষপাতিত্ব নেই, আছে শুধু সময়ের অপেক্ষা। অন্ধ, বধির এক পাথর সময়ের চিরন্তন আহ্বান যাকে রুখে দেওয়ার সাধ্য নেই কোনো অবলা সৃষ্টির।

মানিকগঞ্জে স্যারের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় আমি অংশগ্রহণ করতে পেরেছি, এটা আমার জন্য এক বিশাল প্রশান্তি। ইতিপূর্বে স্যারের মৃতদেহ ২৩ এপ্রিল/২০২৬ তারিখ, সকাল ১০টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বেশ খানিকটা সময় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। সেখানে প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বর্তমান ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারারসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজন ফুলেল শুভেচ্ছায় স্যারকে শেষ বিদায় জানান। জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্বও  তিনি পালন করেছিলেন। সেই স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে জগন্নাথ হলেও লাশবাহী গাড়ি নিয়ে গেলে সেখানেও ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়ে সহকর্মী-কর্মচারীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পথে যানজট না থাকায় আমরা বেশ অল্প সময়েই স্যারের গঙ্গাধর পট্টির বাসায় পৌঁছাই যেখানে আগে থেকেই পরিবারের লোকজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। আমি চেষ্টা করেছি নিজের বিবেকের দায়ভার যেন সারা জীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে না হয়।  সাদামাটা, অনাড়ম্বর অথচ জ্ঞানীয় জগতের উচ্চ শিখরে যে মানুষটা সারা জীবন বিচরণ করেছেন, আচরিত জীবনে দর্শনকে জীবনঘনিষ্ঠ করে পথ চলেছেন নিজে এবং অন্যকেও সেই পথে নিরন্তর উৎসাহিত করেছেন; আপাদমস্তক একজন অসাম্প্রদায়িক মানবিক মানুষের মহাপ্রয়াণে ১৯ এপ্রিল, দর্শন পরিবার তথা জাতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো। স্যারের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বিনয়ের সঙ্গে আবেদন জানাচ্ছি।

♦ লেখক : কলামিস্ট



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews