টরন্টোর মেয়র নির্বাচন এত দিন অনেকটা দুই পরিচিত মুখকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছিল। একদিকে বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাউ, অন্যদিকে বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। আজ বুধবার সেই সমীকরণে হঠাৎ যুক্ত হয়েছেন জাতীয় রাজনীতির পরিচিত এক মুখ। স্টিফেন হারপার সরকারের সাবেক নাগরিকত্ব ও অভিবাসনমন্ত্রী ক্রিস আলেকজান্ডার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি টরন্টোর মেয়র পদে লড়বেন।
৫৭ বছর বয়সী আলেকজান্ডার বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হিসেবে নাম নিবন্ধন করেছেন। আগামী ২৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ শুধু প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ায়নি, বদলে দিয়েছে ভোটের হিসাবও। কারণ, তিনি যেসব ভোটারের সমর্থন চাইবেন, তাঁদের বড় একটি অংশকে গত তিন বছর ধরে নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করছেন ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড।
নগর রাজনীতিতে আগে কখনো নির্বাচিত না হলেও আলেকজান্ডার নিজেকে অনভিজ্ঞ মনে করেন না। তাঁর যুক্তি, সিটি হলের বাইরে দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা তাঁকে টরন্টোর জটিল সমস্যা মোকাবিলার যোগ্য করে তুলেছে। তিনি অভিবাসননীতি নিয়ে কাজ করেছেন, আফগানিস্তানের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মস্কোয় কানাডীয় দূতাবাসে কাজ করার সময় ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়াকেও কাছ থেকে দেখেছেন।
টরন্টো স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলেকজান্ডার বলেছেন, অলিভিয়া চাউয়ের নেতৃত্বে টরন্টো যেন দিক হারিয়েছে। তাঁর মতে, চাউ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও জনসমাগমে উপস্থিত হন এবং মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। এ কারণে নগরবাসীর একটি বড় অংশ তাঁকে সম্মানও করে। কিন্তু শহরটি শক্ত হাতে পরিচালিত হচ্ছে, এমন আস্থা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়নি।
আলেকজান্ডারের অভিযোগ, টরন্টোর গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজনের তুলনায় ধীরগতিতে হচ্ছে। জননিরাপত্তা নিয়েও মানুষের উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের আরেকটি বড় বিষয় হবে শহরের অর্থব্যবস্থা। অলিভিয়া চাউ মেয়র হওয়ার পর গত তিন বছরে সম্পত্তি কর বাড়ানো হয়েছে। আলেকজান্ডারের ভাষায়, নগরবাসীর ওপর যথেষ্ট আর্থিক চাপ পড়েছে।
তবে নির্বাচনী প্রচারে আলেকজান্ডারকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিতর্কিত অধ্যায়েরও মুখোমুখি হতে হবে। ২০১৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনের সময় কনজারভেটিভ পার্টি জোরপূর্বক বিয়ে ও তথাকথিত সম্মান রক্ষার নামে সহিংসতার তথ্য জানাতে একটি হটলাইন চালুর প্রস্তাব দিয়েছিল। এসব অপরাধকে দলটি ‘বর্বর সাংস্কৃতিক চর্চা’ বলে উল্লেখ করে। তৎকালীন নাগরিকত্ব ও অভিবাসনমন্ত্রী ক্রিস আলেকজান্ডার ছিলেন এই প্রস্তাবের অন্যতম প্রবক্তা। সমালোচকদের মতে, হটলাইনটি ছিল মুসলিম ও অভিবাসীবিরোধী এবং এর মাধ্যমে বিশেষভাবে ওই জনগোষ্ঠীকেই সন্দেহের চোখে দেখা ও লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক শহরের মেয়র হতে গিয়ে বিতর্কিত সেই প্রস্তাবের জন্য আলেকজান্ডারকে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। তিনি অবশ্য এখন এটিকে নিজের রাজনৈতিক জীবনের একটি ভুল হিসেবে স্বীকার করছেন। তাঁর ভাষায়, সে সময় কনজারভেটিভদের নির্বাচনী প্রচার ভুল পথে চলে গিয়েছিল।
এর আগে তিনি বলেছিলেন, ওই প্রস্তাব ২০১৫ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। সেই নির্বাচনে অ্যাজাক্স–পিকারিং আসনে আলেকজান্ডার নিজেও হেরে যান।
আলেকজান্ডারের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু করেন ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। বিতর্কিত ‘বর্বর সাংস্কৃতিক চর্চা’ হটলাইন প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এটি টরন্টোর বহু বাসিন্দা, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে গভীরভাবে আহত করেছিল। বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় শহরের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আলেকজান্ডার উপযুক্ত নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর বিতর্ক অবশ্য ২০১৫ সালেই থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে পার্লামেন্টের একটি কমিটিতে অটোয়ার প্রবীণ এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগ তুলে তিনি আবার সমালোচিত হন। ওই সাংবাদিক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, আলেকজান্ডারের বক্তব্য মিথ্যা এবং এতে তাঁর পরিবার বিপদের মুখে পড়েছে।
আলেকজান্ডার চান, বিচ্ছিন্ন কোনো বিতর্ক দিয়ে নয়, তাঁর পুরো কর্মজীবনের ভিত্তিতে ভোটাররা তাঁকে বিচার করুন। তিনি আফগানিস্তানে নারীর অধিকার রক্ষায় নিজের ভূমিকা এবং অভিবাসনমন্ত্রী থাকাকালে শরণার্থী পুনর্বাসনে তাঁর কাজের কথা সামনে আনছেন।
২০১১ সালে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি নাগরিকত্ব ও অভিবাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কূটনীতিক ছিলেন। আফগানিস্তানে কানাডার রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালে আলেকজান্ডার টরন্টোয় ফিরে আসেন। বর্তমানে স্ত্রী হেডভিগ ক্রিস্টিন আলেকজান্ডার ও তিন সন্তানকে নিয়ে সামারহিলের কাছে বসবাস করেন।
আলেকজান্ডারের প্রার্থিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক অবশ্য তাঁর ব্যক্তিগত জীবন বা পুরোনো বিতর্ক নয়, ভোটের হিসাব। ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে অনেক প্রার্থীর মধ্যে ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন অলিভিয়া চাউ। টরন্টোর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি ধারণা হলো, মধ্যপন্থী ও রক্ষণশীল ভোট একজন প্রার্থীর পক্ষে একত্র না হলে প্রগতিশীল প্রার্থীর জয়ের সুযোগ বেড়ে যায়।
ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড এত দিন নিজেকে চাউয়ের বিরুদ্ধে মধ্য-ডানপন্থী ভোটারদের প্রধান বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছিলেন। এখন জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতি, কনজারভেটিভ রাজনীতির যোগাযোগ এবং মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে একই ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন আলেকজান্ডার। এতে চাউবিরোধী ভোট ভাগ হয়ে বর্তমান মেয়রের পুনর্নির্বাচনের পথ সহজ হবে কি না, সেই আলোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
প্রকাশ্যে ব্র্যাডফোর্ড নির্বাচনটিকে নিজের সঙ্গে অলিভিয়া চাউয়ের লড়াই হিসেবে তুলে ধরলেও তাঁর প্রচারশিবির আলেকজান্ডারের প্রার্থিতায় তৈরি হওয়া ঝুঁকি গোপন করছে না। ব্র্যাডফোর্ডের প্রচারের সহসভাপতি মাইক ভ্যান সোয়েলেন সমর্থকদের পাঠানো এক ই-মেইলে আলেকজান্ডারকে ভোট ভাগ করে দেওয়া ‘স্পয়লার’ প্রার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, আলেকজান্ডারের প্রতি যাওয়া ভোট শেষ পর্যন্ত অলিভিয়া চাউয়ের পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনাই বাড়াবে।
বুধবার ক্রিস আলেকজান্ডারের নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে টরন্টোর মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাম লেখানো প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে ৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থিতা জমা দেওয়ার শেষ দিন ২১ আগস্ট। ফলে প্রার্থীর তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
নিবন্ধিত অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন Bahira Abdulsalam, Jamie Atkinson, Darrell Brown, Braden Chiu, Cory Deville, Laura Ellis, Renato Fallico, Martin Fraser, Edward Gong, Faizan Haider, Thomas Hall, Peter Handjis, Heather He, Mohamad Kaki, Georgios Kalkounis, Isidoros Kyrlangitses, Michael Lamoureux, Rick Lee, Eddie Mayanja, Sarah McVie, Joseph Osuji, Odessa Paloma Parker, Amy Rosen, Lyal Sanders, Naomi Sayers, Robert Schusterman, Kannan S’Ri Jr., Weizhen Tang, Jeffrey Tunney ও Jack Wynen। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন আলোচিত তিন প্রার্থী Olivia Chow, Brad Bradford ও Chris Alexander।
আলেকজান্ডারের প্রবেশে একটি বিষয় এখনই পরিষ্কার: টরন্টোর মেয়র নির্বাচন আর অলিভিয়া চাউ ও ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের সোজাসাপ্টা লড়াই থাকছে না। নির্বাচনে নতুন অঙ্ক যোগ হয়েছে। আলেকজান্ডারের প্রার্থিতা কার ভোটে ভাগ বসাবে এবং শেষ পর্যন্ত কাকে সুবিধা দেবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত।
এনএন/ ৩০ জুলাই ২০২৬