জেন জি জুলাই অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ আর কখনো অতীতমুখী রাজনীতিতে ফিরে যাবে না। অতীতমুখী রাজনীতিতে ফিরে না যাওয়া মানে ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয়। বরং ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তাকে সমুন্নত রাখা। গত ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের একটি একপাক্ষিক চেতনাবাজির ন্যারেটিভ। এটি ছিল এ দেশের ভারতীয় এজেন্ট ও ভারতের বশংবদ রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে সত্যিকারের মুক্তিকামী, গণতন্ত্রকামী ও বাংলাদেশপন্থী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও ভিক্টিমাইজ করার বহুমাত্রিক প্রোগ্রাম। কোনো ঐক্যবদ্ধ জাতিকে কৃত্রিম ন্যারেটিভের মাধ্যমে বিভক্ত, গণতন্ত্রহীন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও বিশৃঙ্খল করে তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি টেক্সটবুক এগজাম্পল হচ্ছে, শেখ হাসিনার শাসনামলের বাংলাদেশ। প্রায় ২০ কোটি মানুষের বিশাল সম্ভাবনাময় বাংলাদেশকে চিরস্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা অথবা কাশ্মির, হায়দারাবাদ বা সিকিমের মত লেন্দুপ দর্জি মার্কা শাসকদের ব্যবহার করে দখল করে নেয়ার সুদুর প্রসারি পরিকল্পনা ছিল ভারতের। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর সারা বিশ্ব যখন বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের সম্ভাবনা হিসেবে দেখেছে, ভারত তখন দেশের ৯০ ভাগ মানুষের প্রত্যাশা, আবেগ ও সমর্থনকে উপেক্ষা করে পতিত স্বৈরাচারের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে রীতিমত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে নির্লজ্জ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। গত দেড় যুগ ধরে ভারতীয় ক্রীড়নক সরকার বাংলাদেশে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের ন্যারেটিভ প্রচার করে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মাধ্যমে গুম-খুন, ক্রসফায়ার ও গণহত্যাকাণ্ডের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র ও দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নে সম্ভাব্য যে কোনো কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেয়াই ছিল সে সময়ের আয়রণক্লাড নীতি। একদিকে দেড় কোটি প্রবাসি বিদেশ থেকে রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির ভিতকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর রসদ যোগাচ্ছে, অন্যদিকে দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে বিভিন্ন সেক্টরে কয়েক লাখ ভারতীয়কে অবৈধ উপায়ে কাজ করার সুযোগ দিয়ে দেশ থেকে হাজার কোটি টাকা ভারতে পাচার করার অবাধ সুযোগ দেয়া হয়েছে। রেমিটেন্স ও গার্মেন্ট রফতানি থেকে প্রাপ্ত ডলারের রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে চুরি করে এবং দেশের প্রধান প্রধান তফশিলি ব্যাংকগুলোতে লুটেরা অলিগার্কদের বসিয়ে নামে-বেনামে, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা লোন নিয়ে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে অকার্যকর ও দেশকে দেউলিয়া করে তোলাই ছিল ভারতীয় বশংবদ সরকারের মিশন। হাসিনার পতন ঘটলেও হাসিনার বসানো আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিবাজ দুষ্টচক্র এখনো অক্ষত রয়েছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র মন্ত্রী-এমপি বদল করে দেশের জনগণের প্রত্যাশিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিদেশিদের ষড়যন্ত্র, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও আমলাতন্ত্রে জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পক্ষে জাতীয় ঐক্যের ন্যারেটিভকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে জনসংখ্যা বহুল অঞ্চল। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভর করে শত শত কোটি মানুষের আবাস এবং ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মত তিনটি পারমানবিক সামরিক পরাশক্তির দ্বান্দ্বিক অবস্থান এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। বিশেষত ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী নীতি যখন পৌরাণিক ‘অখণ্ড ভারত’র রূপরেখায় প্রতিবেশিদের উপর আগ্রাসি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন চীনের মত পরাশক্তির সহায়তা ও বন্ধুত্বের বার্তা পাকিস্তান, বাংলাদেশের মত দেশের জন্য অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। বিগত দুই দশকে ভারত তার দুই প্রতিবেশি চীন ও পাকিস্তানের সাথে বেশ কয়েকবার সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়েছে। ভারতের আস্ফালন ও আগ্রাসি নীতির কারণে প্রত্যেকবারই মাঠের বাস্তবতা, অন্য প্রতিবেশি ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন চীন-পাকিস্তানের পক্ষেই গিয়েছে। সাতচল্লিশে দেশভাগ করে বৃটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার অনেক আগেই ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনের আওতায় ম্যাকমোহন লাইন নামে ভারত ও তিব্বতের মধ্যে যে সীমান্তরেখা নির্ধারণ করা হয়েছিল, শুরুতেই চীন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় চীন আকসাই চীন নামে কাশ্মিরের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। সেই থেকে চীনের সাথে ভারতের দ্বন্দ্ব বা সীমান্ত বিরোধ চিরস্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়, শত শত ভারতীয় সেনা নিহত হয় এবং শত শত কিলোমিটার এলাকা চীনা সেনারা দখল করে নেয়। পারমানবিক শক্তি হলেও পাকিস্তানকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তি ভেবে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনের নামে পাকিস্তান সীমান্তে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করতে গিয়েও ভারতীয় সেনাদের বার বার নাস্তানাবুদ অবস্থার চিত্রই বেরিয়ে এসেছে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা জঙ্গি হামলার দায় পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে ভারত পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা করলে ভারতীয় বিমানকে মাটিতে নামিয়ে এনে অভিনন্দন বর্তমান নামের একজন ভারতীয় বৈমানিককে আটক করেছিল পাকিস্তান। দুইপক্ষের সমঝোতার পর সেই বৈমানিককে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছিল পাকিস্তান। গত বছর অপারেশন সিন্দুর নামে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে ভারতীয় বিমান বাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনদিনের মাথায় পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় চরম মার খেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধরে যুদ্ধ বিরতি করতে বাধ্য হয়। অপারেশন সিন্দুরের মোকাবেলায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব ও বীরত্বের কারণে সেনাপ্রধান আসিম মুনির ফিল্ড মার্শাল খেতাবে ভূষিত হন। তারই ধারাবাহিকতায় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারির ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেউলিয়া প্রায় পাকিস্তান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শুধু ঘুরেই দাঁড়ায় নি, নতুন উচ্চতায় আসীন হয়। গত কয়েক মাসে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, তুরস্ক, চীন, সউদি আরবসহ মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে শত শত কোটি ডলারের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা পেয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন গতি ও সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। বিশাল ভারত পাকিস্তানের সাথে আগ্রাসি ভূমিকা নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে চরম পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। চীনের সাথে ভারতের সংঘাতের সময় এমনকি শ্রীলঙ্কা, নেপাল-ভূটানের মত প্রতিবেশীদের সমর্থন ছিল চীনের পক্ষে। গালওয়ানে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় প্রায় শতভাগ হিন্দু অধ্যুসিত দেশ নেপাল ভারতের দাবিকৃত কালাপানি অঞ্চলের বিতর্কিত এলাকাকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছিল।
মূলত ভারতের আগ্রাসি আধিপত্যবাদী নীতির কারণেই ভারত বন্ধুহীন এবং কৌশলগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভূটান বা মালদ্বীপের মত ছোট দেশের সাথে ভারতের বৈরীতার নেপথ্যে কাজ করছে তার অখন্ড ভারতের নীতি। এ ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান অনেকটা ফিলিস্তিনি ও লেবানিজদের সাথে জায়নবাদী ইসরাইলীদের মত। ইসরাইলীরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও দ্বিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক সমাধানে বিশ্বাস করেনা, একইভাবে ভারতীয় শাসকরাও প্রতিবেশিদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কে বিশ্বাস করেনা। তারা মিয়ানমার থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকেই অখন্ড ভারতের অংশ মনে করছে। এমন একটি আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তিকে প্রতিবেশি হিসেবে কেউ সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। চীনে ভারতের গোয়েন্দারা দাঁত বসাতে না পারলেও পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠির উত্থান, শ্রীলঙ্কায় তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গৃহযুদ্ধ, নেপালের রাজপ্রাসাদে ট্রাজিক হত্যাকান্ড, কিংবা বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতা, বিডিআর সদর দফতরে বিদ্রোহের নামে সেনা অফিসারদের ম্যাসাকার ইত্যাদি গণহত্যার সাথে ভারতীয় এজেন্টদের সম্পৃক্ততার ন্যারেটিভ জনমনে প্রোথিত হয়েছে। একবিংশ শতকে এসেও ভারতের এমন আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি পুরো অঞ্চলের নতুন প্রজন্মকেই শুধু নয়, খোদ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের তরুন প্রজন্মের মধ্যে বিজেপি বিরোধী মনোভাব ক্রমে বিস্তার লাভ করছে। প্রতিবেশি দেশগুলোতে ভারতের প্রতি নমনীয় কিংবা ভারতীয় ডিপস্টেট বা সাউথব্লকের সমর্থনপুষ্ট শাসকদের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের নাগরিকদের বিক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে সরকারের বিরুদ্ধে জেন জি গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান, নেপালে জেন জি-দের অভ্যুত্থান ও ক্ষমতা গ্রহণের পর পুরো উপমহাদেশ এক নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন। ২০২৩ সালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান দুই প্রার্থী মোহাম্মদ সলিহর নীতিগত অবস্থান ছিল ‘ভারত প্রথম’ এবং মোহাম্মদ মুইজ্জু চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং ‘ভারত আউট’ নীতি গ্রহণ করে প্রচারণা চালিয়ে মুইজ্জু প্রায় ১০ ভাগ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। আর এবারের নেপালের জেন জি বিদ্রোহের মূল স্পিরিটই ছিল বাংলাদেশের জেন জি প্রজন্মের দেখানো পথে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং পুলিশি নিপীড়ন ও গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমনে কেপি শর্মা ওলির অপচেষ্টা বিপরীত ফল দিয়েছে। মাত্র দুই দিনের আন্দোলনে ৭৭ জন আন্দোলনকারির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটে। অন্তবর্র্তী সরকার গঠনের ৬ মাস পর ২০২৬ সালে ৫মার্চ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন আরএসপি (রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি) ১৮২ আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। জেনজি প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নেপালকে সত্যিকার অর্থে ভারতের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সংকল্প প্রকাশ করেন। সম্প্রতি ভারতের কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি গিয়েছিলেন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে বালেন্দ্র শাহ্র সাথে বৈঠক করতে। বালেন্দ্র শাহ তাদের সাথে বৈঠক করতে রাজি হননি। তার শ্রেফ জবাব ছিল, তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুধুমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথেই বৈঠকে বসতে রাজি আছেন।
বহু শতাব্দী আগে মহাবীর আলেক্জান্ডার ভারত আক্রমণ করতে এসে সিন্ধু অঞ্চলে এক ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসক পুরুর প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। কথিত আছে, আলেক্জান্ডারের সেনারা পুরুকে গ্রেফতার করে তার সামনে হাজির করলে আলেক্জান্ডার তাঁকে প্রশ্ন করেন, তুমি আমার কাছে কেমন আচরণ প্রত্যাশা করো? প্রতিত্তোরে পুরু নাকি সাবলীলভাবে বলেছিলেন, ‘রাজার সাথে রাজার আচরণ যেমনটা হওয়া উচিৎ’। এমন জবাব শুনে খুশি হয়ে আলেকজান্ডার তাকে মুক্তি দিয়ে খুব সহজ শর্তে রাজ্য দান করেছিলেন। রাষ্ট্র ছোটো-বড় হতেই পারে, দ্বিপাক্ষিক অবস্থানের প্রশ্নে এটাই হচ্ছে একজন সরকার প্রধানের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধের দৃষ্টান্ত। মানুষ ভীতু, বশংবদ কিংবা অহংকারি শাসকদের মনে রাখে না। জাতির প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে আত্মমর্যাদা নিয়ে টিকে থাকা কিংবা মরে যাওয়ার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য থাকে না। নেপালের অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে সেই পুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ভারতের প্রতিবেশিরা নিজেদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্রমেই সচেতন ও আপসহীন হয়ে উঠেছে। ভারত কি তার ভুল বুঝতে সক্ষম হচ্ছে? ভারতের বাইরে কেউ একা নয়। ভারতের প্রতিবেশিদের সাথে চীন-পাকিস্তানসহ বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে। ভারতকে তার অখন্ড ভারতের স্বপ্ন ও আধিপত্যবাদী নীতি পরিহার করতেই হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অভিন্ন নদীর উজানে বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে পানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থেকে ভারত রেহাই পাবেনা। চীনের সহযোগিতায় পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা ভারতের আগ্রাসী নীতির প্রাথমিক প্রতিবিধান মাত্র। সেই ষাটের দশকের শুরুতে ভারত সিন্ধু অববাহিকার নদীগুলোর পানি বন্টনে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সাথে পানিবন্টন চুক্তিতে আবদ্ধ হলেও বাংলাদেশের সাথে একই ধরণের পানি বন্টন চুক্তি না করে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের দুর্বুদ্ধি ও দুর্র্বত্তায়নের আশ্রয় নেয়ার খেসারত ভারতকে দিতেই হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি বহুমাত্রিক অভিঘাতের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। পানি আগ্রাসনের পর ভারতীয় ন্যারেটিভের সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিদ্ধংসী ভূমিকা ছিল রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে জাতিকে বিভক্ত ও অস্থিতিশীল করে রাখার কারসাজি। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জঙ্গি, মৌলবাদী ও রাজাকার তকমা দিয়ে কোনঠাসা করার ন্যারেটিভ হিসেবে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলার প্রতিক্রিয়ায় জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিল। ভারতের শাসকদের আধিপত্যবাদী বৈষম্যনীতি এখন ভারতীয় জেন জি প্রজন্মের কাছেই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে চলেছে। সম্প্রতি(১৫ মে) ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত একটি মামলার শুনানির সময় দেশের বেকার তরুন সমাজকে নিয়ে একটি মন্তব্যে বলেন, ‘দেশে এমন কিছু তরুণ আছে, যারা ‘ককরোচ’ বা আরশোলার মতো। তারা না কোনো কর্মসংস্থান পায়, না নিজেদের পেশাগত কোনো অবস্থান তৈরী করতে পারে। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী হয়ে ওঠে, কেউ কেউ হয় আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট, এবং তারা সবাইকেই আক্রমণ করতে শুরু করে।’ হাসিনার ‘রাজাকার’ শব্দের প্রতিক্রিয়ার মতোই ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের জেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব অভিজিৎ দিপকে বিজেপি’র প্যারোডি হিসেবে সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টি নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামেন। ইতিমধ্যে ককরোচ জনতা পার্টি বিভিন্ন রাজ্যে এবং রাজপথে তাদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করে তোলতে সক্ষম হয়েছে। এই ককরোচ জনতা ভারতের বৈষম্য ও আধিপত্যবাদী সাম্প্রদায়িক নীতির বিরুদ্ধে জেন জি প্রজন্মের প্রতিবাদী অংশের প্রতিনিধি। বৈষম্য, আধিপত্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ভারতের এই জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই উপমহাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা ফলপ্রসু হতে পারে।