জন্মের প্রথম ঘণ্টাতেই বুকের দুধ শুরু হোক, সুস্থ থাকুক মা ও শিশু। "মায়ের বুকের দুধ শিশুর প্রথম টিকা, প্রথম খাবার এবং প্রথম ভালোবাসা।" Ñএই বার্তাকে সামনে রেখে প্রতি বছর ১-৭ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। আর পুরো আগস্ট মাসজুড়েই বিভিন্ন দেশে মাতৃদুগ্ধপান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর নানা কর্মসূচি নেয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু করা এবং প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর লাখ লাখ শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। এরপর ছয় মাস পূর্ণ হলে উপযুক্ত পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি অন্তত দুই বছর বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধপানের হার আগের তুলনায় উন্নত হলেও এখনও অনেক মা নানা ভুল ধারণা, সামাজিক চাপ, কর্মস্থলের সীমাবদ্ধতা এবং ফর্মুলা দুধের আগ্রাসী প্রচারণার কারণে শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না।জন্মের পর কখন বুকের দুধ শুরু করবেন?
শিশু জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা উচিত। এটি "গোল্ডেন আওয়ার" নামে পরিচিত। জন্মের পরপরই মায়ের বুকে শিশুকে ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখলে-
 শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে।
 শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন স্থিতিশীল হয়।
 শিশুর কান্না কমে।
 বুকের দুধ দ্রুত নামতে সাহায্য করে।
 মা ও শিশুর মানসিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
শালদুধ: শিশুর প্রথম টিকা- জন্মের পর প্রথম ২-৩ দিন যে ঘন হলুদাভ দুধ বের হয়, সেটিই শালদুধ বা কলোস্ট্রাম। অনেক পরিবার এখনও ভুলভাবে এটিকে নোংরা বা বাসি দুধ মনে করে ফেলে দেন। এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ধারণা। কলোস্ট্রাম হলো-
Ω প্রাকৃতিক প্রথম টিকা
Ω অ্যান্টিবডিতে ভরপুর
Ω সংক্রমণ প্রতিরোধকারী
Ω শিশুর অন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়
Ω জন্ডিস কমাতে সাহায্য করে
Ω মিকোনিয়াম দ্রুত বের হতে সহায়তা করে
প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ দিন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে-
 পানি নয়
 মধু নয়
 মিছরির পানি নয়
 গ্লুকোজ নয়
 গরুর দুধ নয়
 ফর্মুলা নয়
 কোনো কিছুই প্রয়োজন নেই, যদি না চিকিৎসক বিশেষ কোনো কারণ দেখান। মায়ের বুকের দুধেই শিশুর পানি, পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান থাকে।
বুকের দুধ বাড়াতে মা কী করবেন?
অনেক মা বলেন, "আমার দুধ হয় না।" বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমস্যা দুধের ঘাটতি নয়; বরং শিশুর সঠিকভাবে স্তন ধরতে না পারা বা পর্যাপ্ত ঘন ঘন দুধ না খাওয়ানো। দুধ বাড়াতে যা করবেন-
 শিশুকে চাহিদামতো বারবার বুকের দুধ দিন।
 দিনে-রাতে ৮-১২ বার পর্যন্ত দুধ খাওয়াতে পারেন।
 প্রতিবার একটি স্তন ভালোভাবে শেষ করে অন্য স্তন দিন।
 রাতে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না।
 মা পর্যাপ্ত পানি-তরল পান করবেন।
 সুষম খাদ্য গ্রহণ করবেন।
 পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেবেন।
 মানসিক চাপ কম রাখবেন।
 পরিবার থেকে সহযোগিতা নেবেন।
 মনে রাখতে হবে, যত বেশি শিশু দুধ টানবে, তত বেশি দুধ তৈরি হবে।
সঠিকভাবে শিশুকে বুকে ধরার নিয়ম ঃ বুকের দুধ সফলভাবে খাওয়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক অবস্থান (পজিশনিং) ও সঠিকভাবে স্তন ধরা (এটাচমেন্ট বা ল্যাচ)। সঠিক পজিশন-
 মা আরাম করে বসবেন বা শুয়ে থাকবেন।
 শিশুর মাথা, কাঁধ ও শরীর একই সরলরেখায় থাকবে।
 শিশুর পুরো শরীর কাত কওে মায়ের দিকে ফিরিয়ে রাখবেন।
 শিশুর নাক স্তনের বোঁটার সামনে থাকবে।
 শিশুকে স্তনের দিকে আনবেন; স্তনকে শিশুর দিকে ঠেলে দেবেন না।
সঠিক এটাচমেন্টের লক্ষণ, শিশু যখন ঠিকমতো স্তন ধরবে-
 মুখ বড় করে খুলবে।
 শুধু বোঁটা নয়, বোঁটার চারপাশের কালো অংশের বেশিরভাগ মুখে থাকবে।
 নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে মোড়ানো থাকবে।
 থুতনি স্তনের সঙ্গে লেগে থাকবে।
 গিলতে থাকার শব্দ শোনা যাবে।
 মায়ের ব্যথা হবে না।
শিশুকে দুধ খাওয়ানোর বিভিন্ন পজিশনঃ প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ভঙ্গি ব্যবহার করা যায়-
 ক্র্যাডল হোল্ড
 ক্রস-ক্র্যাডল হোল্ড
 ফুটবল বা ক্লাচ হোল্ড
 সাইড-লাইং পজিশন (বিশেষ করে সিজারিয়ানের পর)
 মা যে অবস্থায় স্বস্তি পান এবং শিশু ভালোভাবে স্তন ধরতে পারে, সেটিই সবচেয়ে ভালো পজিশন।
শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে কীভাবে বুঝবেন? 
 প্রতিদিন ৬-৮ বার বা তার বেশি প্রস্রাব করবে।
 নিয়মিত ওজন বাড়বে।
 দুধ খাওয়ার পর শান্ত থাকবে।
 শিশুর ত্বক ও চোখ স্বাভাবিক থাকবে।
 বারবার পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকবে না।
শিশুর জন্য বুকের দুধের উপকারিতা- বুকের দুধ শিশুর জন্য প্রকৃতির সবচেয়ে পরিপূর্ণ খাদ্য। এর মাধ্যমে-
 ডায়রিয়া কমে।
 নিউমোনিয়া কমে।
 কানের সংক্রমণ কমে।
 অপুষ্টি কমে।
 অ্যালার্জির ঝুঁকি কমে।
 হাঁপানির ঝুঁকি কমতে পারে।
 স্থূলতার ঝুঁকি কমে।
 টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
 শিশুর মেধা বিকাশে সহায়তা করে।
 রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
 হঠাৎ শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
মায়ের জন্য বুকের দুধের উপকারিতা ঃশুধু শিশুই নয়, মায়েরও অসংখ্য উপকার হয়।
 প্রসবের পর জরায়ু দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
 অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কমে।
 সন্তান জন্মের পর ওজন কমাতে সহায়তা করে।
 স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
 ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
 টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
 উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে।
 প্রসবোত্তর বিষণœতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
 মা ও শিশুর মানসিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
কর্মজীবী মায়েরা কী করবেন? অনেক মা চাকরিতে ফিরে যাওয়ার পর বুকের দুধ বন্ধ করে দেন। অথচ কিছু পরিকল্পনা করলে বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
 মাতৃত্বকালীন ছুটি যথাযথভাবে ব্যবহার করুন।
 অফিসে দুধ বের করে সংরক্ষণ করুন।
 পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন।
 বাসায় পরিচর্যাকারীকে সংরক্ষিত দুধ খাওয়ানোর নিয়ম শেখান।
 কর্মস্থলে ল্যাকটেশন কর্নার থাকলে ব্যবহার করুন।
ফর্মুলা দুধের ক্ষতিকর দিক ঃ চিকিৎসাগত বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ফর্মুলা দুধের কোনো সুবিধা বুকের দুধের সমান নয়। সম্ভাব্য অসুবিধাÑ
¤ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
¤ ডায়রিয়া বেশি হয়।
¤ নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
¤ ভুলভাবে তৈরি করলে অপুষ্টি হতে পারে।
¤ অতিরিক্ত ঘন করলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে।
¤ অ্যালার্জির ঝুঁকি থাকতে পারে।
¤ দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
¤ ব্যয়বহুল।
¤ নিরাপদ পানি না থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
¤ এতে জীবন্ত রোগপ্রতিরোধী উপাদান নেই।
তবে যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক বিশেষভাবে ফর্মুলা দুধের পরামর্শ দেন, সেসব ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
পরিবার ও স্বামীর ভূমিকা ঃ মাতৃদুগ্ধপান শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো পরিবারের দায়িত্ব। স্বামী যা করতে পারেনÑর্
মাকে মানসিক সাহস দিন। রাতে শিশুকে এনে মায়ের কাছে দিন। ঘরের কাজে সহায়তা করুন। পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দিন। ফর্মুলা দুধের অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করবেন না। দাদা-দাদি, নানা-নানি ও পরিবারের অন্য সদস্যদেরও পুরোনো ভুল ধারণা পরিহার করে মাকে উৎসাহিত করতে হবে।
জনগণের করণীয় ঃ
 বুকের দুধ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা।
 গর্ভাবস্থায় কাউন্সেলিং নেওয়া।
 হাসপাতালে জন্মের পর দ্রুত বুকের দুধ শুরু করা।
 কর্মজীবী মায়েদের সহযোগিতা করা।
 সামাজিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা।
 ফর্মুলা দুধের অযৌক্তিক প্রচারণা নিরুৎসাহিত করা। সরকার কী করছে?
বাংলাদেশ সরকার মাতৃদুগ্ধপান বাড়াতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় নবজাতক ও শিশুখাদ্য নীতি।
 সরকারি হাসপাতালে স্তন্যদান কাউন্সেলিং।
 মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি।
 শিশুখাদ্যের বিকল্প পণ্যের প্রচারণা নিয়ন্ত্রণে আইন।
 কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি।
 ইপিআই ও মাতৃস্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে পরামর্শ প্রদান।
সরকার আরও কী করতে পারে?
 প্রতিটি হাসপাতালে বাধ্যতামূলক ল্যাকটেশন কাউন্সেলর নিয়োগ।
 বেবি-ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা।
 সব কর্মস্থলে ল্যাকটেশন রুম বাধ্যতামূলক করা।
 কর্মজীবী মায়েদের জন্য নমনীয় কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা।
 ফর্মুলা দুধের বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
 গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা।
 স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ।
 প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃদুগ্ধ সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা-
ভুল: ছোট স্তনে দুধ কম হয়।
সত্য: স্তনের আকার নয়, দুধ উৎপাদন নির্ভর করে শিশুর সঠিকভাবে ও ঘন ঘন দুধ খাওয়ার ওপর।
ভুল: গরমে শিশুকে পানি দিতে হবে।
সত্য: প্রথম ছয় মাস বুকের দুধই যথেষ্ট।
ভুল: মা অসুস্থ হলে বুকের দুধ বন্ধ করতে হবে।
সত্য: অধিকাংশ সাধারণ অসুস্থতায় বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া নিরাপদ। তবে বিশেষ কিছু রোগ বা ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মাতৃদুগ্ধ কোনো সাধারণ খাদ্য নয়; এটি শিশুর জীবনের ভিত্তি, রোগ প্রতিরোধের প্রথম ঢাল এবং সুস্থ ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ। জন্মের প্রথম ঘণ্টায় বুকের দুধ শুরু করা, প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং দুই বছর বা তার বেশি সময় বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়াÑএই তিনটি পদক্ষেপ একটি শিশুর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি শিশু সুস্থ থাকলে একটি পরিবার সুস্থ থাকে; একটি পরিবার সুস্থ থাকলে একটি জাতি শক্তিশালী হয়। তাই আগস্টের এই সচেতনতার মাসে আমাদের অঙ্গীকার হোকÑ"প্রতিটি নবজাতকের অধিকার, জন্মের পরপরই মায়ের বুকের দুধ।" মা, পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম এবং সরকারÑসবাই একসঙ্গে কাজ করলেই বাংলাদেশে মাতৃদুগ্ধপানের হার আরও বাড়বে এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমিয়ে একটি সুস্থ, সবল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ডা. জহুরুল হক সাগরসহকারী অধ্যাপক,নবজাতক-শিশু-কিশোর মেডিসিন বিশেষজ্ঞহলি কেয়ার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনোস্টিক সেন্টার,জিয়া সরনী, শনির আখরা, কদমতলি, ঢাকা।ফোন: ০১৮৯১৯৮৪৬৭০: ০১৩৩৫১৩৬৯১০।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews