বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপের তালিকায় সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা টেলিগ্রামের নামই বেশি শোনা যায়। তবে চীনে চিত্রটা ভিন্ন। সেখানে বার্তা আদান-প্রদান থেকে শুরু করে কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, ট্যাক্সি বুকিং, সরকারি সেবা গ্রহণ, এমনকি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার মতো কাজও করা যায় একটি অ্যাপের মাধ্যমে। সেই অ্যাপটির নাম উইচ্যাট।
চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেন্সেন্ট ২০১১ সালে উইচ্যাট চালু করে। সময়ের সঙ্গে এটি একটি সাধারণ মেসেজিং অ্যাপের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ‘সুপার অ্যাপ’-এ পরিণত হয়েছে। টেনসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত উইচ্যাট ও উইক্সিন মিলিয়ে মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৪০ কোটির বেশি।
উইচ্যাট কী?
উইচ্যাট মূলত একটি মেসেজিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অ্যাপ। শুরুতে এটি বার্তা আদান-প্রদানের জন্য চালু হলেও বর্তমানে এতে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের ডিজিটাল সেবা।
এখন ব্যবহারকারীরা টেক্সট মেসেজ, ভয়েস ও ভিডিও কল, ছবি ও ভিডিও শেয়ারিং, গ্রুপ চ্যাট, সামাজিক যোগাযোগ, ডিজিটাল পেমেন্টসহ বিভিন্ন অনলাইন ও ব্যবসায়িক সেবা ব্যবহার করতে পারেন।
চীনে এত জনপ্রিয় কেন?
উইচ্যাটের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হলো এক প্ল্যাটফর্মে একাধিক সেবা পাওয়া। বিশ্বের অনেক দেশে বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা অ্যাপ ব্যবহার করতে হলেও চীনে এসব কাজের বড় অংশই উইচ্যাটের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। এ কারণেই প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা অ্যাপটিকে প্রায়ই ‘এভরিথিং অ্যাপ’ বা ‘সুপার অ্যাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শুধু চ্যাট নয়, আরও অনেক কিছু
উইচ্যাট ব্যবহার করে টেক্সট, অডিও ও ভিডিও বার্তা আদান-প্রদান করা যায়। রয়েছে উচ্চমানের ভয়েস ও ভিডিও কলের সুবিধা। গ্রুপ চ্যাট পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবহারকারীরা উইচ্যাট পের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনও করতে পারেন, যেখানে এ সেবা চালু রয়েছে।
এ ছাড়া ‘মিনি প্রোগ্রামস’ সুবিধার মাধ্যমে আলাদা অ্যাপ ডাউনলোড ছাড়াই বিভিন্ন সেবা ব্যবহার করা যায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করে সংবাদ, তথ্য ও সেবা পাওয়া যায়। ব্যবহারকারীরা স্বল্প ও দীর্ঘ ভিডিও দেখতে এবং প্রকাশ করতেও পারেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সেবা পরিচালনায় উইচ্যাটকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ থেকে ব্যবহার করা যায়?
বাংলাদেশ থেকেও উইচ্যাট ব্যবহার করা সম্ভব। গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে অ্যাকাউন্ট খোলা যায়। তবে কিছু সেবা, বিশেষ করে উইচ্যাট পে, সব দেশে একইভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। অনেক ফিচার ব্যবহারকারীর অবস্থান, ব্যাংকিং সুবিধা এবং স্থানীয় নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল।
অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম
নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরির জন্য প্রথমে অ্যাপটি ডাউনলোড করে মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হয়।
তবে স্প্যাম ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট প্রতিরোধে অনেক ক্ষেত্রে নতুন ব্যবহারকারীকে বিদ্যমান কোনো উইচ্যাট ব্যবহারকারীর মাধ্যমে কিউআর কোড বা নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হতে পারে। ফলে সবার জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া এক রকম নাও হতে পারে।
সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
একটি অ্যাপে একাধিক ডিজিটাল সেবা, দ্রুত বার্তা আদান-প্রদান, উন্নতমানের ভয়েস ও ভিডিও কল, ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুবিধা এবং মিনি প্রোগ্রামস ব্যবহারের সুযোগ উইচ্যাটের বড় সুবিধাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন ফোন চার্জে রেখে ব্যবহার করলে কি ব্যাটারির আয়ু কমে?

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। চীনের বাইরে কিছু সেবা সীমিতভাবে ব্যবহার করা যায় এবং অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ফিচারে পার্থক্য থাকতে পারে। এছাড়া নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার সময় নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া অনেকের কাছে জটিল মনে হতে পারে।
গোপনীয়তা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। তাই ব্যবহারকারীদের অ্যাপটি ব্যবহারের আগে এর গোপনীয়তা নীতিমালা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
কারা বেশি উপকৃত হবেন?
চীনে বসবাস, পড়াশোনা বা ব্যবসা পরিচালনা করেন—এমন ব্যক্তিদের জন্য উইচ্যাট প্রায় অপরিহার্য একটি অ্যাপ। পাশাপাশি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বা চীনা গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
যোগাযোগ, পেমেন্ট, ব্যবসা ও অনলাইন সেবাকে এক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করে উইচ্যাট চীনের ডিজিটাল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সব সুবিধা সব দেশে সমানভাবে না মিললেও চীনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা পেশাগত যোগাযোগ রয়েছে এমন ব্যবহারকারীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।