বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এবং বর্তমান সরকারের সময়েও ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হলো খেলাপি ঋণ। আমাদের দেশে ঋণ পরিশোধ না করার যে অপসংস্কৃতি বিদ্যমান, তারই ধারাবাহিকতার ফল হলো খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন করে ব্যাংকিং খাতে আরও সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ যুক্ত হয়েছে। যেখানে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এক শতাংশ ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কেন? কীভাবেই বা এর থেকে উত্তরণ সম্ভব? সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা ও সহায়তা কি আদৌ কার্যকর হবে না? সুতরাং, ব্যাংকিং খাতে এবং গ্রাহক পর্যায়ে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। সবারই প্রত্যাশা, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ শূন্যে না নামলেও অন্তত কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নেমে আসুক। কিন্তু কীভাবে সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা এখনো অনেকটাই দূরে অবস্থান করছেন।
প্রথমেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যাক। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে, ২০২৪ সালের জুনে, খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই সরকারের আমলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। কারণ, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ তফসিলিকরণের ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা জনসম্মুখে তুলে ধরার উদ্যোগ নেয়। এর ফলে বোঝা যায় দেশের ব্যাংকিং খাত কতটা ভগ্নদশাগ্রস্ত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেই লোন প্রভিশনিং-সংক্রান্ত বিআরপিডি সার্কুলার-১৫ জারি করে। এর ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ঋণ খেলাপি হওয়ার শর্ত ৬ মাস থেকে কমিয়ে ৩ মাস করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় লোন প্রভিশনিং ও রিশিডিউলিংয়ের জন্য তিনটি পরিপত্র ও সার্কুলার জারি করা হয়, উদ্দেশ্য মূলত দেশের ব্যাংক খাতকে স্বস্তি দেওয়া। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা বিআরপিডি সার্কুলারের মাধ্যমে বলা হয়, ২ শতাংশ জমা দিলেই খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা যাবে। সার্কুলারে আরও বলা হয়, ২ শতাংশ নগদ অর্থ জমা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাওয়া যাবে; উক্ত ঋণ পরিশোধের জন্য ১০ বছর সময় দেওয়া হবে এবং ঋণটি পরিশোধের ক্ষেত্রে আরও ২ বছর গ্রেস পিরিয়ড বা পরিশোধ-বিরতি সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এর ভবিষ্যৎ কী? এর আগেও ১৬ মে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক একই ধরনের সুবিধা দিয়েছিল, যা বিআরপিডি সার্কুলার-৫ নামে পরিচিত। সেই সময় ২২ জানুয়ারী, ২০২০ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়, ‘সংসদে ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ’ প্রতিবেদনে তথ্য উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে সেপ্টেম্বরে মোট ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অথচ গত মার্চ, ২০২৬ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। আবার ‘মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে এসব ব্যাংকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে ওই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা’ (২ জুন ২০২৬, প্রথম আলো)।
আমাদের দেশে খেলাপি ঋণধারীদের সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্ট মহল বেশ তৎপর। ফলে ঋণ পরিশোধ না করে বারবার ঋণ তফসিলের সুযোগ নেওয়ার প্রবণতায় মত্ত থাকেন অনেক খেলাপি ঋণগ্রহীতা। সবাই জানেন, বছর শেষে কিংবা বছরের মাঝামাঝি সময়ে মন্দ ঋণ বা খেলাপি ঋণ পুনরায় পূর্ণ তফসিলের জন্য কোনো না কোনো ছাড় দেওয়া হবে। সুতরাং এসব খেলাপি ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করে অপেক্ষায় থাকেন, কখন নতুন সার্কুলার জারি হবে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত তিন থেকে চারটি সার্কুলার বা নীতিগত পরিবর্তন জারি করেছে। বর্তমান সরকারও খেলাপি ঋণ নিয়ে একটি নীতিগত পরিবর্তন করেছেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে এতবার পরিপত্র ও সার্কুলারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তাতে এসব সুবিধাভোগী তথাকথিত খেলাপি ঋণগ্রহীতারা কেনই বা ঋণ পরিশোধে আগ্রহী হবেন? সুতরাং ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করার যে অপসংস্কৃতি বিদ্যমান, তা থেকে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত খুব সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে এই খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মনে করেন না।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুটি উপায়ে কমানো সম্ভব। প্রথমটি হলো ঋণ আদায়ের মাধ্যমে। তবে ঋণ আদায় ও বিতরণের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, যা আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত বলে মনে হয়। দ্বিতীয় উপায় হলো ঋণ বিতরণের মাধ্যমে। অর্থাৎ আপনি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যত বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণ করবেন, মোট ঋণের তুলনায় খেলাপি ঋণের হার তত কমে আসবে। ধরুন, কোনো একটি ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে ৬০ কোটি টাকা খেলাপি বা অনাদায়ী। সেক্ষেত্রে বিতরণকৃত মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ। এখন যদি নতুন করে ঋণ বিতরণ না করা হয়, তাহলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিভিন্নভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রথমত, খেলাপি ঋণের ওপর সুদ আরোপের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ভালো ঋণগুলো আদায় হয়ে যাওয়ায় মোট ঋণের পরিমাণ কমে যাবে। ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাত আরও বেড়ে যাবে। অপরদিকে, যদি নতুন করে ঋণ বিতরণ করে মোট ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা থেকে ৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয় এবং নতুন বিতরণকৃত ঋণগুলো কোনোভাবেই অনাদায়ী হতে না দেওয়া হয়, তাহলে খেলাপি ঋণের হার নেমে আসবে ২০ শতাংশে। পাশাপাশি ঋণ বিতরণের ফলে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জিত হলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশনও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। ফলে দুর্বল ব্যাংকের ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে যদি আস্থা না থাকে, তাহলে ওই ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করতে পারবে না এবং নতুন করে বিনিয়োগও করতে পারবে না। সুতরাং ব্যাংকটির ধ্বংস হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। আর সেটিই আমরা অনেকটা নিজেদের হাতেই ঘটিয়ে ফেলছি।
ব্যাংকিং খাত অস্থির হওয়ার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হলো নিয়ম-নীতির অস্থিতিশীলতা। অর্থাৎ নিয়ম-নীতিগুলো খুব সহজেই পরিবর্তন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনগুলো বড় বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়। যে কারণে ব্যাংকিং খাতে স্বস্তি ফিরে আসা বা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। আপনি যদি দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে চান এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে চান, তাহলে অবশ্যই ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যা হচ্ছে, তা ব্যাংকিং খাতের জন্য এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা কোনো সুস্থ অর্থনীতির জন্যই কাম্য নয়। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে হলে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে নীতি সুদহারসহ সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একমাত্র সুশাসনই পারে দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরলে ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি। সুতরাং, দেশে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে হবে।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]