আমাদের শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে শিশুশিক্ষার্থীদের স্কুলে/মাদ্রাসায় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পরীক্ষা পদ্ধতিতে ফিরে যাবেন বলে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করার পর থেকেই আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মেধা যাচাই করে ভালোদের বাছাই করে ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষা পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া উচিত। যদিও আমাদের দেশে তথাকথিত ভালো স্কুল হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাইকৃত ভালো শিক্ষার্থীদের স্কুল। ভর্তি পরীক্ষার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা তো আমাদের প্রায় সবারই কম/বেশি আছে!

অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনেকেই বলছেন, ভর্তি পরীক্ষা হলে যেহেতু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং কোচিং বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ইত্যাদি অনিয়ম ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পায় সেহেতু লটারি পদ্ধতিতে থাকাই ভালো। অন্য কেউ কেউ বলছেন, লটারি পদ্ধতি ও পরীক্ষা পদ্ধতির বাইরে এসে উন্নত দেশের মতো ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক শিক্ষার্থী ভর্তি করা উচিত। তারা বলেন, উন্নত দেশে নিজের এলাকার স্কুলেই ভর্তি হয় সকল শিশুশিক্ষার্থী। তাদের ভর্তির জন্য পরীক্ষা হয় না, লটারি হয় না।

বাস্তবে অনেক উন্নত দেশে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিশেষ করে শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভর্তির জন্য কোন পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না, লটারির প্রয়োজন হয় না। কেননা, সেসব দেশের প্রতিটি এলাকাতেই প্রায়োজ মাফিক উন্নত মানের স্কুল রয়েছে এবং সে স্কুলে ওই এলাকার শিক্ষার্থীদের ভর্তির বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের সকল এলাকায় সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান সমান বা কাছাকাছি নেই, কোন কোন ক্ষেত্রে আকাশ পাতাল ব্যবধান। তাই অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশে ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক ভর্তির বিষয়টি সফলভাবে কার্যকর করা সম্ভব নয়। এ বাস্তবতা অনেকেই জানেন না, ভাবেন না, মানেন না!

প্রয়োজনে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান সমান বা কাছাকাছি করার জন্য উন্নত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উত্তম পরিচালনা কমিটি গঠন, অত্যন্ত দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, অধিক বেতনে সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের দক্ষতা ক্রমাগত বৃদ্ধি, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ প্রয়োগ, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক। সে পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আলোচিত সকল দিক বিবেচনায় আপাতত লটারি ব্যবস্থাই উত্তম বলে প্রতীয়মান হয়।

এমন এলাকা আছে যেখানে স্কুল ও মাদ্রাসার সংখ্যা ওই এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। যেমন, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের পেটের ভিতরে সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল এন্ড কলেজ অবস্থিত। তার পাশেই মোহাম্মদপুর সরকারি বালক বিদ্যালয়, আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাদেরিয়া তৈয়বিয়া মাদ্রাসা এবং এগুলোর আশেপাশেই অগণিত কেজি স্কুল অবস্থিত। এসকল প্রতিষ্ঠানের ক্যাচমেন্ট এরিয়া সম্পূর্ণ আলাদা করা মোটেও সম্ভব নয় এবং এগুলোর মান মোটেও সমান নয়, বরং আকাশ পাতাল ব্যবধান। এর যে কোনোটিতে শূন্য আসনের তুলনায় অধিক শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন করলেই পরীক্ষা বা লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রয়োজন হবে। ঢাকা শহরে এবং দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে বা বিভাগীয় শহরে এমন চিত্র কম/বেশি বিদ্যমান।

অভিভাবকগণ যখন বুঝবেন বা জানবেন যে, ‘ভালো’ স্কুলের আশেপাশে বসবাস করলেই সে স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করা যাবে তখন অনেক অতি চালাক অভিভাবক অন্য কৌশল অবলম্বন করবে। তারা ওই এলাকায় বসবাসের বিভিন্ন ভুয়া প্রমাণপত্র সংগ্রহ করবে। এদেশে ভুয়া/ভাড়া বর্তমান ঠিকানা দেখিয়ে আর্জেন্ট পাসপোর্ট তৈরি করা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন সনদ বানানো যায় এবং কমিশনার অফিসের সনদ নেওয়া যায় —এসব কথার/তথ্যের কি কোনো সত্যতা নেই? আগের তারিখ দিয়ে বাড়িওয়ালার সঙ্গে ভাড়াচুক্তি তৈরি করবে। সে বাড়ির পানির বিল ও বিদ্যুৎ বিলের কপি দিবে। সেসব দিয়ে বসবাসের প্রমাণ অথেন্টিক হয় না। কেননা, এগুলো বাড়ির মালিকের নামে থাকে, ভাড়াটিয়ার নামে থাকে না।

অতি সচ্ছল অভিভাবক টাকা খরচ করে একটি বাসা আগে থেকেই ভাড়া করে রাখবে অথবা আরো বেশি টাকা থাকলে ভবিষ্যৎ বংশধরদের ‘ভালো’ স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনে ফেলবে এবং সেটিতে তিনি অনেক আগে থেকেই ভাড়া থাকতেন এমন প্রমাণ তৈরি করবে। অর্থাৎ তথাকথিত ভালো বা মানসম্পন্ন যাই হোক ওই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করানোর অধিকার অধিক টাকাওয়ালাদেরই থাকবে। সারাদেশের সকল এলাকায় প্রকৃত মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকার ফলাফল এমন হওয়াই আমাদের দেশের বাস্তবতা।

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন দেওয়ার সময় ক্যাচমেন্ট এরিয়া বিবেচনা করা হয়নি বা মেনে চলা হয়নি। সাধারণ শিক্ষাবোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পারস্পরিক সমন্বয় না করেই যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষাবোর্ড থেকে যেখানে স্কুলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেখানেই আবার মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে মাদ্রাসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর আশেপাশে আবার অনুমোদনহীন অগণিত কেজি স্কুল রয়েছে। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এ সকল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু শিক্ষিত বেকার মিলে স্কুল বা মাদ্রাসা বা কেজি স্কুল তৈরি করে নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। হয় সরকারি বিধি-বিধান সঠিক না থাকায়, নয় সরকারি বিধি-বিধানের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় এগুলোর অবকাঠামো ও শিক্ষকদের মান রক্ষা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা তারা অনুভব করেনি বা করতে বাধ্য হয়নি। এমন লাগামহীন চিত্র সারাদেশে অনেক আছে।

আবার সারাদেশে অনেক এলাকা আছে যেখানে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত কম এবং কোনোটিই কাঙ্ক্ষিত মানসম্পন্ন নয়। ঐ সকল এলাকার শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার বাইরে গিয়ে তুলনামূলক বেশি মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার আগ্রহ দেখাতেই পারে। কেননা, মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভালো শিক্ষা অর্জনের মৌলিক অধিকার প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আছে এবং এটি নিশ্চিত করা কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র কি এখনই সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম? নিশ্চয়ই না।

এ অবস্থার উন্নয়নে সদিচ্ছা থাকলেও সেটি অনেক ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কেননা, প্রয়োজনে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান সমান বা কাছাকাছি করার জন্য উন্নত শিক্ষানীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উত্তম পরিচালনা কমিটি গঠন, অত্যন্ত দক্ষ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, অধিক বেতনে সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের দক্ষতা ক্রমাগত বৃদ্ধি, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ প্রয়োগ, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতকরণ অত্যাবশ্যক। সে পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আলোচিত সকল দিক বিবেচনায় আপাতত লটারি ব্যবস্থাই উত্তম বলে প্রতীয়মান হয়।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষাগবেষক।

এইচআর/এএসএম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews