বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাংস্কৃতিক অঙ্গ সংগঠন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা’ (জাসাস) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। লক্ষ্য ছিল জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ এবং একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। তবে চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংগঠনটি এখনো সেই লক্ষ্যে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।

জাসাসের নেতাকর্মীদের মতে, সংগঠনটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই মূলত জাতীয় ও দলীয় দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, দেশের অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও জাসাস এখনো একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো বা কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

নেতৃত্ব ও কাঠামোগত দুর্বলতা
২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক মামুন আহমেদের নেতৃত্বাধীন জাসাসের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই বলেই জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা।

এরপর ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর নতুন কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে অভিনেতা হেলাল খান আহ্বায়ক এবং জাকির হোসেন রোকন সদস্য সচিব হন। ৭১ সদস্যের এই কমিটির মাধ্যমে ৬৫টি জেলা, কয়েকটি বিদেশি শাখা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করা হয় বলে জানা গেছে।

তবে সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও বর্তমান কমিটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বহাল রয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, রোকনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মূলত অনুষ্ঠান আয়োজনেই সীমাবদ্ধ।

একজন সাবেক জাসাস নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রখ্যাত অভিনেতা ওয়াসিমুল বারী রাজীব ২০০৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাসাসের নেতৃত্বে ছিলেন। এরপর থেকেই সংগঠনটির পতন শুরু হয়। এখন জাসাস শুধু দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ, আর আহ্বায়ক হেলাল খান বেশিরভাগ সময় বিদেশে থাকেন।”

জাসাস কেন পিছিয়ে
দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার সময়ে আওয়ামী লীগ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি করেছে। বহু খ্যাতিমান শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মী এই ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালেও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব এখনো লক্ষণীয়।

বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় ঐতিহ্যকে রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে যুক্ত করে আওয়ামী লীগ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছে।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীও সাহিত্য, সংগীত, অনুবাদ ও বিকল্প সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের একটি আলাদা সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে। ইসলামিক বইমেলা ও কাওয়ালির মতো আয়োজন এর উদাহরণ।

এর বিপরীতে, জাসাসের নেই দৃশ্যমান উপস্থিতি—না সংগীত, না নাটক, না সাহিত্য বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে। ফলে নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের আকৃষ্ট করতেও ব্যর্থ হচ্ছে সংগঠনটি।

ব্যর্থতার দায় কার?
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার আর্টস বিভাগের গবেষণা ফেলো ইফতি শাহরিয়ার রাইয়ান মনে করেন, জাসাসের ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে।

তার ভাষ্যে, “অতিরিক্ত রাজনৈতিক নির্ভরতা শিল্পের স্বাধীনতাকে সীমিত করেছে, ফলে সৃজনশীলতা বিকশিত হয়নি। পাশাপাশি ধারাবাহিক চর্চা ও নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার অভাব সংগঠনটিকে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নিতে দেয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণ মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে না পারায় জাসাসের উদ্যোগগুলো সমাজে গভীর প্রভাব ফেলতে পারেনি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের সাংস্কৃতিক অঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের মনন গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক দর্শনকে শক্তিশালী করে।”

তার মতে, “যুদ্ধ বা বোমা দিয়ে একটি জাতিকে ধ্বংস করা যায় না; তার সংস্কৃতি ধ্বংস করলেই জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। অথচ জাসাস প্রতিষ্ঠার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো নেতৃত্ব বা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পারেনি।”

ভবিষ্যত সম্ভাবনা কতটুকু?
এ প্রসঙ্গে বর্তমান সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন দাবি করেন, বিগত সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করার সুযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, “১৭ বছর আমরা শিল্পকলা একাডেমি, এফডিসি বা বাংলা একাডেমিতে কাজ করতে পারিনি। সেই পরিস্থিতিতে কাজ করা কঠিন ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, শিল্পীরাও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।”

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আমাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারব।”

চার দশক পরও জাসাসের সামনে বড় প্রশ্ন—কীভাবে তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একটি প্রাণবন্ত, সৃজনশীল ও প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলবে?

বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী নেতৃত্ব, ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীর সংযোগ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই জাসাস নতুন করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
সূত্র: ঢাকা স্ট্রিম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews