অবৈধপথে আফ্রিকা মহাদেশের লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার সময় যে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জে।
জানা যায়, শুক্রবার জীবিতদের সাগর থেকে উদ্ধারের পর গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ বাংলাদেশি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর এমন মর্মান্তিক কাহিনি শুনিয়েছেন বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশিরা।
ইউরোপ যাওয়ার পথে ভূমধ্য সাগরে স্বজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর নিহতদের বাড়িতে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তাদের সন্তানদের মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে দালাল চক্র মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এসব দালালের বিচারের পাশাপাশি অবৈধপথে ইউরোপ যাত্রা রোধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা। নিহত সাহান এহিয়ার বড় ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, এক মাস আগে দালালের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে ইউরোপ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে রওনা দেন। কয়েক দিন তাদের কোনো খোঁজ ছিল না। মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। শনিবার বিকালে চাচাতো ভাই রোহান ফোনে জানান ইয়াহিয়াসহ গ্রামের মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, দালালের মাধ্যমে ইঞ্জিনচালিত ছোট একটি নৌকায় গাদগাদি করে তাদের পাঠানো হয় ইতালির উদ্দেশে। কিন্তু নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে দিগি¦দিক ঘুরতে থাকলে একপর্যায়ে তাদের খাবার ও পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়। এভাবে ছয় দিন অনাহার-অর্ধাহারে থাকায় ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। একপর্যায়ে লাশ পচে গেলে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা। এদিকে, ইউরোপ যাওয়ার পথে যে ১৮ জন বাংলাদেশির সলিল সমাধি হয়েছে তাদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। ইতোমধ্যে পুলিশ তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা ১২ জনের নাম-পরিচয় জানতে পেরেছি। পুলিশ, পরিবার, স্বজন ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১২ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন দিরাই উপজেলার বাঁশরি গ্রামের সুহান, মাটিয়াপুরি গ্রামের তায়েফ, তারাপাশা গ্রামের মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না, সাজিদুর রহমান, সাহান এহিয়া, রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান। এ ছাড়া, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী। দিরাই উপজেলার ছয়জন নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বজনদের জানিয়েছেন উদ্ধার হওয়া তারাপাশা গ্রামের আবদুল কাহারের ছেলে রোহান আহমদ। গ্রিস থেকে তিনি জানিয়েছেন, বোট পথ হারিয়ে ফেলার পর ছয় দিন তারা সাগরে ভাসছিলেন। এতে করে তাদের খাবার ও পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়। ক্রমান্বয়ে বোটের অনেকেই মারা যায়। তাদের মধ্যে তার এলাকার চরজন ছিলেন। পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সুনামঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার জানান, সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার সময় সাগরে ১২ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আমরা অনুসন্ধান করছি, এর পেছনে স্থানীয় কোনো দালাল চক্র জড়িত কি না। থাকলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যাওয়া রোধে সচেতনা সৃষ্টি করা হবে বলে জানান তিনি।