রেস্তোরাঁ, কফিশপ কিংবা বারগুলোতে এখন শুধু কর্মীরাই নয়, টিপস চাইছে রোবটও। ডিজিটাল স্ক্রিনে খাবার বা পানীয়ের দাম পরিশোধের সময় অনেক জায়গায় যুক্ত হচ্ছে টিপ দেওয়ার অপশন। তবে রোবটকে দেওয়া সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট তথ্যটি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ভেনেশিয়ান হোটেলের দ্য টিপসি রোবট বারে দুটি রোবটিক হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ককটেল তৈরি করে পরিবেশন করে। একটি মার্গারিটার দাম ১৭ ডলার হলেও এর সঙ্গে ১০ শতাংশ ‘সার্ভিস ফি’ যোগ করা হয়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে নিউইয়র্কের আর্টলি কফিতে, যেখানে রোবট বারিস্তা টিপস চেয়েছে। নিউআর্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি কর্মীহীন সেলফ-চেকআউট কিয়স্কেও পানির বোতল কেনার সময় টিপ দেওয়ার পরামর্শ দেখা গেছে। আবার পোর্টল্যান্ডের টপ বার্মিজ রেস্তোরাঁয় মানুষের নেওয়া অর্ডার রোবট পরিবেশন করে।
তবে রোবটকে টিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অনেকেই দ্বিধায় পড়ছেন। কারণ মানুষের ভালো সেবা বা পরিশ্রমের জন্য টিপ দেওয়া হলেও রোবটকে টিপ দেওয়ার যুক্তি কী, সেটি স্পষ্ট নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, সেই অর্থ আসলে কে পাচ্ছে।
দ্য টিপসি রোবট ও আর্টলি কফির প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, রোবটের মাধ্যমে পাওয়া সব টিপস তাদের মানব কর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং কোম্পানি কোনো অংশ নেয় না। গ্রাহকদের অভিযোগের পর আর্টলি কফি অনেক শাখায় টিপ দেওয়ার ডিজিটাল অপশনও বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব প্রতিষ্ঠান একই নিয়ম অনুসরণ করছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও ‘গ্র্যাচুইটি’ বইয়ের সহলেখক হোলোনা ওচস বলেন, কিছু অসাধু নিয়োগকর্তা রোবটকে দেওয়া টিপস নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার মতে, মূল প্রশ্ন হলো কে লাভবান হচ্ছে এবং এর মূল্য কে দিচ্ছে। মানুষের জন্য দেওয়া টিপসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কোম্পানি, মালিক ও সুপারভাইজাররা কর্মীদের টিপ থেকে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু রোবটকে দেওয়া টিপসের মালিকানা নিয়ে এখনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি।
করোনাভাইরাস মহামারির পর যুক্তরাষ্ট্রে আরও বেশি জায়গায় টিপস চাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে গ্রাহকদের সামনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট হারে টিপ দেওয়ার অপশনও আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রে টিপনির্ভর কর্মীদের জন্য ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ২ দশমিক ১৩ ডলার পর্যন্ত কম হতে পারে। ফলে অনেক কর্মীর আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে টিপস থেকে। কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। রোবট নিজে কোনো মজুরি পায় না। তাই রোবটের মাধ্যমে আদায় করা টিপস কর্মীদের দেওয়া হচ্ছে, নাকি প্রতিষ্ঠানই রেখে দিচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞ ওচসের মতে, বর্তমানে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নিয়ম নেই। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে রোবটের মাধ্যমে নেওয়া টিপস কর্মীদের বদলে করপোরেশনের কাছে গেলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তবে রোবট প্রযুক্তিকে শুধু কর্মীদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
আর্টলি কফির কনটেন্ট পরিচালক অ্যাবিগেইল স্মাদার্স বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে রোবটের উপস্থিতির কারণে কিছু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি খরচ কমানোর জন্য মানুষের জায়গায় রোবট বসানোর পক্ষে নয় বলেও জানান তিনি।
হসপিটালিটি প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপির সহযোগী অধ্যাপক কাতেরিনা বেরেজিনা বলেন, রোবট ব্যবহারের পেছনে সবসময় শুধু মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্য থাকে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
তার মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিপ বা সার্ভিস ফি রোবট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শ্রমের খরচ মেটাতেও ব্যবহার করা হতে পারে।
তবে শ্রমিক অধিকার সংগঠন ওয়ান ফেয়ার ওয়েজের মতো কিছু সংগঠনের দাবি, রেস্তোরাঁ খাতে কম মজুরি দেওয়ার প্রবণতাই শ্রমিক সংকটের বড় কারণ এবং রোবট ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সমস্যা আড়াল করা হচ্ছে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও টিপিং নিয়ে গবেষণার লেখক মাইকেল লিনের মতে, মানুষ সাধারণত ভালো সেবার পুরস্কার হিসেবে কিংবা কম মজুরি পাওয়া কর্মীদের সহায়তা করতে টিপ দেয়। সামাজিক চাপও অনেক সময় টিপ দেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে এসব কারণ প্রযোজ্য নয়। তাই রোবটকে টিপ দেওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন তিনি।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী রোবট বারটেন্ডারকে টিপ দিতে আগ্রহী ছিলেন। তবে যারা বাস্তবে রোবট বারটেন্ডারের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তারা অন্যদের তুলনায় টিপ দিতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রোবটকে দেওয়া টিপস মানব কর্মীদের কাছে যাবে জানানো হলে প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ টিপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোবটকে টিপ দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের আচরণের ওপরই নির্ভর করবে। যদি মানুষ এ ধরনের টিপিং পছন্দ না করে এবং এতে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোও একসময় এই ব্যবস্থা বন্ধ করতে পারে।
অর্থাৎ, রোবটের ডিজিটাল হাত টিপসের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়তো প্রযুক্তির ভবিষ্যতের স্থায়ী চিত্র নয়। বরং এটি হতে পারে গ্রাহক, কর্মী ও ব্যবসার মধ্যে বদলে যাওয়া সম্পর্কের একটি পরীক্ষামূলক অধ্যায়।